ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:
ব্রেকিং নিউজ

আব্দুল খালেক

১১ জানুয়ারি ২০২২, ১৪:০১

কাজাখস্তানে জনগণ মাটিতে নামালো স্বৈরশাসক নাজারবায়েভের মূর্তি

23793_nnbd-1.jpg
কাজাখস্তানে কয়েকদিন ধরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলছে। এক পর্যায়ে বিক্ষুব্ধরা আলমাটি শহরের থানাগুলো দখল করার চেষ্টা করে। নিরাপত্তা বাহিনী অভিযান চালিয়ে ১৩৫ জন সাধারণ মানুষকে হত্যা করে। নিরাপত্তা বাহিনীর মেশিনগান, স্টান গ্রেনেড ও বিস্ফোরণের মুহুর্মুহু শব্দে কেঁপে উঠে রাজধানী। মঙ্গলবার পশ্চিম কাজাখস্তানের মানজিসতাও শহরে প্রায় ৫ হাজার মানুষ সরকারের পদত্যাগের দাবিতে র‍্যালির আয়োজন করলে পুলিশ তাতে অভিযান চালায়। এরপরেই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে দেশব্যাপী।

কাজাখ প্রেসিডেন্টের অনুরোধে রাশিয়া 'দেশটিকে স্থিতিশীল করার জন্য' সৈন্য পাঠাচ্ছে। বলা হচ্ছে রাশিয়া, কাজাখস্তান, বেলারুস, তাজিকিস্তান, কিরগিজস্তান ও আরমেনিয়াকে নিয়ে গঠিত সিএসটিও নামে যে যৌথ নিরাপত্তা চুক্তি করা হয়েছে - তার অধীনেই রুশ সৈন্য পাঠাচ্ছে। কাজাক প্রেসিডেন্ট কাসিম-জোমার্ট তোকায়েভ নিজের গদি রক্ষায় সিটিএস’র সহায়তা চেয়েছেন।

রাশিয়ার বাহিনী এ মুহূর্তে দরিদ্র কাজাখদের পাখির ন্যায় গুলি করে মারছে। কিন্তু গত ৩২ বছর নাজারভায়েব পরিবার দেশটিকে যে লুটেপুটে খেয়েছে, তাতে বাধ সাধেনি কমিউনিজমের ধ্বজাধারী রাশিয়ার। যদিও পুতিন বলেছেন, ‘সন্ত্রাসী, অপরাধী ও লুটেরাদের আক্রমণ থেকে কাজাখস্তান রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি ও জনগণকে রক্ষা করেছে কাজাখ-রুশ সেনাবাহিনী। ইউরোপ-আমেরিকাও খুব বেশি কিছু বলেনি এতদিন, কারণ নাজারবায়েভ পরিবার ও কাজাখ এলিটদের পাচারকৃত সম্পদের বড় বড় বিনিয়োগ রয়েছে লন্ডনসহ পশ্চিমের বড় বড় শহরগুলোতে।

কাজাখস্তান বিশ্বে খনি-সম্পদে অন্যতম ধনী দেশ, অথচ আজ সামনে থেকে বিক্ষোভ করতে হচ্ছে প্রধানত খনি শ্রমিকদের। যদিও বিশ্বমিডিয়া বলছে গ্যাসোলিনের দাম বাড়ানো থেকে এই বিক্ষোভের শুরু। কিন্তু তা আংশিক সত্য মাত্র। মূলত, কয়েক দশক ধরে সমাজে বিদ্যমান চরম বৈষম্য থেকে সৃষ্ট পুরনো ক্ষোভ থেকে বিক্ষোভের শুরু। এর মধ্যে দেশটিতে জারি করা হয়েছে জরুরি অবস্থা। কারফিউ কার্যকর রয়েছে শহর জুড়ে। সভা সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়েছে কঠোরভাবে।

আলমাতির বাসিন্দা স্থানীয় একটি নার্সারি স্কুলের শিক্ষক ২৮ বছরের সমল বার্তাসংস্থা এএফপিকে বলেছেন, ‘আমি জানতাম না যে, আমাদের লোকজন এতো ভয়ঙ্কর হতে পারে।’

পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে আরেক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, ১৯৯১ সালের পর এত সহিংসতা দেখা যায়নি কাজাখস্তানে।

নুরসুলতান আবিশেভিচ নাজারবায়েভ জন্ম ১৯৪০সালের ৬ জুলাই। তিনি ১৯৮৯ সালে কাজাখ সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম সচিব হিসাবে মনোনিত হন। ১৯৯০ সালের ২৪ শে এপ্রিল থেকে ২০১৯ সালের ১৯ এ মার্চ পর্যন্ত কাজাখস্তানের প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপরই তিনি "জাতির পিতা" উপাধি ধারণ করেন। তিনি কাজাখস্তানের নিরাপত্তা কাউন্সিলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন দীর্ঘদিন যাবত।

রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনকালে নাজরবায়েভ এবং তার চক্রের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। সমালোচকরা বলছেন যে দেশটির সরকার একটি বংশ ব্যবস্থার সদৃশ হয়ে এসেছে। দ্য নিউইয়র্কের সুত্রে জানা যায়, ১৯৯৯ সালে সুইস ব্যাংকের কর্মকর্তারা নাজারবায়েভের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে ৮ শ’পঞ্চাশ কোটি ডলার আবিষ্কার করেন।

কাজাখ গণবিক্ষোভ শুরুর পরই লন্ডনে অনেক কোম্পানির শেয়ার দর পড়তে শুরু করে। এই দুইয়ের সংযোগটি সচেতন পাঠকমাত্রই বুঝতে পারবেন। একচেটিয়া লুন্ঠনের পাশাপাশি নাজারভায়েব গত ৩২ বছরে দেশটিতে নিজের অনেক মূর্তি গড়েছিলেন। রাজধানীর নাম নিজের নামে করে নিয়েছিলেন। কিন্তু ক্ষমতার জোরে বানানো মূর্তি চিরস্থায়ী নয় বছরের শুরুতেই সেটাই জানিয়ে দিলো কাজাখস্তানের জনগণ।

রাশিয়ার পোড়ামাটি নীতির কারণে কাজাখ প্রতিবাদীদের হয়তো পিছু হটতে হচ্ছে এ মুহূর্তে কিন্তু নাজারভায়েবের মূর্তি ধুলোয় নামিয়ে আনার জন্য তাদের অভিবাদন জানাতেই হয়। এ যেন রবার্ট ব্রাউনিংয়ের পেট্রিয়ট কবিতার পুনরাবৃত্তি। সাধারণ জনগণ যেমন দেশপ্রেমিকদেরকে সর্বোচ্চ শিখরে স্থান দিতে পারে , তেমনি মাটিতেও মিশিয়ে দিতে পারে। কবি একজন দেশপ্রেমিকের ভাষ্যে কবিতাটি বর্ণনা করেছেন।

এক বছর পূর্বে রঙ্গিন ফল দিয়ে তার আগমনকে বরণ করা হয়েছিল। তখন গির্জার চূড়াগুলোতে পতাকা টানানো ছিল এবং তাকে এক নজর দেখার জন্য মানুষ বাড়ির ছাদে পর্যন্ত উঠেছিল। বংশী বাজিয়ে তার আগমন ঘোষিত হয়েছিল। মানুষের মাঝে কী যে উন্মাদনা! তখন জনগণ তার জন্য যে কোন কিছু করতে প্রস্তুত ছিল। কিন্তু এখন সব কিছু পরিবর্তন হয়ে গেছে। তার অপকর্মের জন্যে তাকে পেছনে হাত বেঁধে ফাঁসির মঞ্চে নেওয়া হচ্ছে। কেউ তাকে এখন আর স্বাগত জানায়নি বরং পাথর ছুঁড়ে তাকে রক্তাক্ত করা হয়েছিল। কী দুর্ভাগ্যবান সে, যে তার সারাটি জীবন দেশের মানুষের জন্য ব্যয় করেছেন।

সর্বকালে এমন দিনই স্বৈরাচার নাজারভায়েবদের সামনে ঘুরেফিরে আসে কিন্ত তারা শিক্ষা গ্রহণ করে না। প্রবাদে আছে যে,‘ইতিহাসের মূল শিক্ষা হলো ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা গ্রহণ করে না।’

কাজাখস্তান ১৯৯১ সালের ১৬ ডিসেম্বর নিজেকে স্বাধীন দেশ হিসেবে ঘোষণা করেছিল। সর্বশেষ দেশটিকে সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র বলে ঘোষণা করে কমিউনিস্ট যুগের নেতা নুরসুলতান নাজারবায়েভ। দেশের নতুন রাষ্ট্রপতিও হন তিনি। স্বাধীনতার পর থেকে কাজাখস্তান তথাকথিত সুষম বন্টন ও বৈদেশিক নীতি অনুসরণ করছে বলা হয়।

দেশটির অর্থনীতি বিশেষত হাইড্রোকার্বন শিল্পের বিকাশে কাজ করেছে। দেশটির অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির উন্নতি হওয়ার সময় রাষ্ট্রপতি নাজারবায়েভ দেশের রাজনীতিতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশ কয়েকজন বিরোধী নেতা এবং সাংবাদিক নিহত হয়েছেন এবং পশ্চিমা পর্যবেক্ষকরা সাধারণত কাজাখস্তানের নির্বাচনকে অবাধ ও নিরপেক্ষ বলে বিবেচনা করেন না। তবুও, কাজাখস্তানের আন্তর্জাতিক প্রতিপত্তি গড়ে উঠছে। এটি এখন মধ্য এশিয়ায় প্রভাবশালী রাষ্ট্র হিসাবে বিবেচিত হয়। দেশটি জাতিসংঘ, ন্যাটো'র অংশীদারত্বের জন্য শান্তির স্বতন্ত্র রাষ্ট্র বলে স্বীকৃতি দেয় সুবিধা ভোগকারী পশ্চিমাগোষ্ঠী।

প্রতিটি সংগ্রামই মানুষকে অনেক কিছু শেখায়। কাজাখরা আবারো চিনতে শুরু করেছে তাদের শত্রু-মিত্র। হয়তো বিশ্বের সকল নিপীড়িতের জন্যও এতে বহু শিক্ষা আছে। বিক্ষোভ শুরুর পরপরই নাজারবায়েভ পরিবার ৫টি প্রাইভেট জেটে করে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে মস্কোতে। মস্কো, বেইজিং, ওয়াশিংটন, লন্ডন, রিয়াদ, দুবাই এসব জায়গাতেই নাজারবায়েভদের খুঁটি বাঁধা। তবুও যুগে যুগে নিপীড়িত জনগণের বিজয় অনিবার্য। সেই শুভদিনের প্রতিক্ষায় কাজাখস্তানের বিপ্লবী জনগণ।

আব্দুল খালেক
কলামিস্ট ও গবেষক