ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:
ব্রেকিং নিউজ

নিজস্ব প্রতিবেদক

৬ জানুয়ারি ২০২২, ১১:০১

বঙ্গোপসাগরে বিপুল পরিমাণ মিথেন গ্যাস ও শৈবালের সন্ধান

23619_গ্যাস-অনুসন্ধান-640x335.jpg
বঙ্গোপসাগরে বিপুল পরিমাণ মিথেন গ্যাস ও শৈবালের সন্ধান পেয়েছে মেরিটাইম অ্যাফেয়ার্স ইউনিট।

বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন।

১৭ থেকে ১০৩ ট্রিলিয়ন কিউবিক টিসিএফ গ্যাস সেখানে থাকার অনুমানের তথ্য জানান হয়েছে এক জরিপের উপাত্তের ভিত্তিতে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সমুদ্রে গ্যাস হাইড্রেট ও জেনেটিক সম্পদের গবেষণায় বঙ্গোপসাগরে বিপুল বাণিজ্যের সম্ভাবনা হিসেবে ২২০ প্রজাতির শৈবাল ও ৩৪৭ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ পাওয়া গেছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গবেষণায় বঙ্গোপসাগরে গ্যাস হাইড্রেট পাওয়া গেছে। এটি মূলত, উচ্চচাপ ও নিম্ন তাপমাত্রায় গঠিত জমাট বরফ আকৃতির এক ধরনের কঠিন পদার্থ, যা স্তূপ আকারে থাকা বালির ছিদ্রের ভেতরে ছড়ানো স্টম্ফটিক আকারে কিংবা কাদার তলানিতে ক্ষুদ্র পিন্ড, শিট বা রেখা আকারে বিদ্যমান থাকে। এই গ্যাস হাইড্রেট থেকে মিথেন গ্যাস পাওয়া সম্ভব।

গবেষণায় দেখা যায়, মহীসোপানের প্রান্তসীমায় ৩০০ মিটারের বেশি গভীর সমুদ্রের তলদেশে গ্যাস হাইড্রেট পানি ও মাটির চাপে মিথেন বা স্টম্ফটিক রূপে পাওয়া যায়। সাধারণত এই গ্যাস হাইড্রেট ৫০০ মিটার গভীরতায় স্থিতিশীল অবস্থায় থাকে। স্থিতিশীল গ্যাস হাইড্রেট সমৃদ্ধ এ অঞ্চল সমুদ্রের তলদেশে প্রায় ১০ থেকে ১০০ মিটার পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরো জানান, গবেষণায় বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার ভেতরে ২২০ প্রজাতির শৈবাল (সি উইড), ৩৪৭ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ, ৪৯৮ প্রজাতির ঝিনুক, ৫২ প্রজাতির চিংড়ি, ৬১ প্রজাতির সি-গ্রাস, পাঁচ প্রজাতির লবস্টার এবং ছয় প্রজাতির কাঁকড়া চিহ্নিত হয়েছে। গবেষণায় নির্দিষ্ট প্রজাতির কিছু সমুদ্র শৈবাল ব্যবহারের মাধ্যমে পাঁচটি বাণিজ্যিক সম্ভাবনাও নির্দিষ্ট করা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ের মাধ্যমে ২০১২ সালে মিয়ানমার এবং ২০১৪ সালে ভারতের সাথে সমুদ্রসীমা নির্ধারণের ফলে বাংলাদেশ মূল ভূখণ্ডের ৮১ শতাংশ পরিমাণ রাষ্ট্রীয় জলসীমা অর্জন করেছে। এতে সমুদ্রে এক লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের ওপর বাংলাদেশের সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এই অর্জন দেশের সমুদ্র ও উপকূলীয় অঞ্চলে সর্ব প্রকার সম্পদ আহরণ, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল, পর্যটন ইত্যাদি ঘিরে কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধির নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।

২০১৮ সালে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের অধিকৃত জলসীমায় গ্যাস হাইড্রেটের উপস্থিতি, অবস্থান, প্রকৃতি ও মজুদ নির্ধারণের লক্ষ্যে পরিচালিত জরিপসমূহের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দফতরের অভিজ্ঞ ও দক্ষ প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে মেরিটাইম অ্যাফেয়ার্স ইউনিটের প্রধান খুরশেদ আলমের নেতৃত্বে একটি ডেস্কটপ স্টাডি গ্রুপ গঠন করা হয়। জাতিসঙ্ঘে মহীসোপানের সীমানা নির্ধারণ বিষয়ক কমিশনে বাংলাদেশের দাবি সংবলিত সাবমিশনটি প্রস্তুতের সময় সরকার ২০০৭-০৮ সালে বঙ্গোপসাগরে ফ্রান্সের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিন হাজার ৫০০ লাইন কিলোমিটার এবং ২০১০ সালে নেদারল্যান্ডসের একটি প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় প্রায় তিন হাজার লাইন কিলোমিটার সিসমিক ও ব্যাথিম্যাট্রিক জরিপ সম্পন্ন করে। এসব জরিপে ৩৫০ নটিক্যাল মাইলের ভেতরে মহীসোপানে ছয় হাজার ৫০০ লাইন কিলোমিটার পর্যন্ত সমুদ্রাঞ্চলে থাকা সম্পদের বিষয়ে বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়, যা বাপেক্স, পেট্রোবাংলা এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মেরিটাইম অ্যাফেয়ার্স ইউনিটে সংরক্ষিত রয়েছে। এসব জরিপের তথ্য-উপাত্তের ওপর ভিত্তি করেই ডেস্কটপ স্টাডিটি পরিচালনা করা হয়।

ডেস্কটপ স্টাডি গ্রুপ গঠনের পর যুক্তরাজ্যের সাউদাম্পটনে অবস্থিত ন্যাশনাল ওশেনোগ্রাফি সেন্টারসহ পেট্রোবাংলা, বাপেক্স এবং স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের যৌথ প্রয়াসে গত তিন বছর টানা কাজ করা হয়েছে। বর্তমানে স্টাডিটি সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এতে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের অধিকৃত জলসীমায় গ্যাস হাইড্রেটের উপস্থিতি এবং এর অবস্থান, প্রকৃতি ও মজুদের ব্যাপারে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া গেছে। সিসমিক লাইনের অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের শুধুমাত্র একান্ত অর্থনৈতিক অঞ্চলে (ইইজেড) শূন্য দশমিক ১১ থেকে শূন্য দশমিক ৬৩ ট্রিলিয়ন কিউবিক ফিট সম্ভাব্য প্রাকৃতিক গ্যাস হাইড্রেট জমার ধারণা পাওয়া গেছে, যা ১৭ থেকে ১০৩ ট্রিলিয়ন কিউবিক ফিট প্রাকৃতিক গ্যাস মজুদের সমতুল্য। দেশের ইইজেড ও মহীসোপানের সব এলাকার পূর্ণাঙ্গ সিসমিক জরিপ সম্পন্ন করা হলে প্রকৃত মজুদ নিরূপণ করা সম্ভব হবে। তবে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণের ওপর ভিত্তি করে বলা যায়, বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য এলাকায় প্রাকৃতিক গ্যাস হাইড্রেটের উপস্থিতি থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

বঙ্গোপসাগর বিশেষ করে ভারতের কৃষ্ণ-গোদাভারী এবং মহানন্দা বেসিনে বিপুল পরিমাণ গ্যাস হাইড্রেট মজুদের সম্ভাবনার বিষয়ে ইতোমধ্যে নিশ্চিত হওয়া গেছে। কৃষ্ণ-গোদাভারী, মহানন্দা বেসিন এলাকায় প্রতি বছর এক থেকে দুই বিলিয়ন টন মিশ্রিত তলানি জমা হয়। ভারত কৃষ্ণ-গোদাভারী এবং মহানন্দা বেসিনে এবং আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে তিনটি স্থানে কূপ খনন করেছে। মহানন্দা বেসিনে সাগরের তলদেশে ২০৫ মিটার নিচে ২৫ মিটার পুরু একটি স্তরে প্রায় ১৫ শতাংশ প্রাকৃতিক গ্যাস হাইড্রেটের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

গ্যাস হাইড্রেট তথা মিথেন গ্যাস মূলত উচ্চ চাপ ও নিম্ন তাপমাত্রায় গঠিত জমাট বরফ আকৃতির এক ধরনের কঠিন পদার্থ, যা স্তূপকৃত বালুর ছিদ্রের ভেতরে ছড়ানো স্ফটিক আকারে অথবা কাদার তলানিতে ক্ষুদ্র পিণ্ড, শিট বা রেখা আকারে বিদ্যমান থাকে। মহীসোপানের প্রান্তসীমায় ৩০০ মিটারের অধিক গভীরতায় সমুদ্রের তলদেশের নিচে গ্যাস হাইড্রেট পানি ও মাটির চাপে মিথেন বা স্ফটিক রূপে পাওয়া যায়, যা সাধারণত ৫০০ মিটার গভীরতায় স্থিতিশীল অবস্থায় থাকে। স্থিতিশীল গ্যাস হাইড্রেট সমৃদ্ধ এ অঞ্চলটি সমুদ্র তলদেশ থেকে ১০ থেকে ১০০ মিটার পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে। মিথেন গ্যাস অন্য জীবাশ্ম জ্বালানির তুলনায় অনেক বেশি পরিবেশবান্ধব। তবে গ্যাস-হাইড্রেট উত্তোলনের প্রযুক্তি সহজলভ্য না হওয়ায় অনেক উন্নত দেশ এখনো এটি উত্তোলন শুরু করতে পারেনি। আশা করা যায়, অচিরেই এই প্রযুক্তি সহজলভ্য হবে এবং বাংলাদেশ বিভিন্ন উন্নত দেশের কাছ থেকে প্রযুক্তি নিয়ে গ্যাস হাইড্রেট উত্তোলনের প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবে।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, সুনীল অর্থনীতি উন্নয়ন কর্মপরিকল্পনার আলোকে রিয়ার অ্যাডমিরাল (অব:) খুরশেদ আলমের নেতৃত্বে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মেরিটাইম অ্যাফেয়ার্স ইউনিট নেদারল্যান্ডস সরকারের আর্থিক সহায়তায় বাংলাদেশের সমুদ্র এলাকায় গত দুই বছর মেরিন জেনেরিক রিসোর্সের (এমজিআর) উপস্থিতি, সার্বিক অবস্থান, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তথা বাণিজ্যিকীকরণ যাচাইয়ের লক্ষ্যে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। এমজিআর সমুদ্রের প্রাণিজ ও উদ্ভিদ সংক্রান্ত সব সম্পদকে বুঝায়। গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে বাংলাদেশে ২২০ প্রজাতির সামুদ্রিক শৈবাল, ৩৪৭ প্রজাতির মাছ, ৪৯৮ প্রজাতির ঝিনুক, ৫২ প্রজাতির চিংড়ি ইত্যাদি চিহ্নিত করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে এসব প্রজাতির ওপর প্রয়োজনীয় ল্যাবরেটরি টেস্ট নেদারল্যান্ডসে সম্পন্ন হয়। গবেষণালব্ধ ফলাফলে প্রতীয়মাণ হয় যে, বাংলাদেশে প্রাপ্ত বহু সংখ্যক প্রজাতির সামুদ্রিক শৈবালের মধ্যে কয়েকটি প্রজাতির ব্যাপক বাণিজ্যিক সম্ভাবনা রয়েছে, যা বাংলাদেশের সমুদ্র অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে সক্ষম। এ প্রেক্ষাপটে পরবর্তী পদক্ষেপ হচ্ছে, আগ্রহী ও যোগ্য শিল্প প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোক্তাদের সামুদ্রিক শৈবালের সম্ভাবনাময় বিবিধ খাতে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করা। এ কার্যক্রম সফল করার লক্ষ্যে যোগ্য শিল্প প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোক্তাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মেরিটাইম অ্যাফেয়ার্স ইউনিট প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে। ইতোমধ্যে এ ব্যাপারে দেশের সংশ্লিষ্ট শিল্প গ্রুপগুলোর সাথে আলোচনা শুরু হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (সমুদ্র সীমা অনুবিভাগ) রিয়ার অ্যাডমিরাল (অব.) মোহাম্মদ খুরশেদ আলম।