ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:
ব্রেকিং নিউজ

নাজমুল ইসলাম, স্টাফ রিপোর্টার

৪ ডিসেম্বর ২০২১, ১১:১২

করোনায় দেশের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার হাল-চাল!

22683_14.jpg
করোনায় গোটা বিশ্ব যখন বিপর্যস্থ তখন দেশের শিক্ষার গুণগত মান কতটুকু ধরে রাখা সম্ভব তা নিয়ে মহামারি শুরু হওয়ার আগেও প্রশ্ন ছিল, এখন তো কথাই নেই। এ অবস্থায় শিক্ষা ব্যাবস্থার লাভ-ক্ষতি খুঁজতে গেলে ক্ষতির পাল্লাটাই ভাড়ী থাকবে। এই বিশাল সংকট মোকাবেলায় প্রয়োজন সঠিক সিদ্ধান্ত ও তা বাস্তবায়ন।

মহামারি করোনার দুঃসময় পার করা প্রায়ই ১৮ মাসের বেশি সময় পার করে ধাপে ধাপে প্রাণ ফিরে পেয়েছে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। করোনার ধাক্কায় সবচাইতে নাজেহাল পরিণতি হয়েছে দেশ ও জাতির উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক শিক্ষা ব্যবস্থাপনার। তবে করোনাভাইরাসের গ্রাস থেকে মুক্তি পেতে গোটা বিশ্ব প্রতিনিয়ত লড়াই অব্যাহত রেখেছে। এর মধ্যেই আবার ‘ওমিক্রন, নামক নতুন ভ্যারিয়ান্ট আবারো শঙ্কায় ফেলেছে বিশ্ববাসীকে।

দীর্ঘদিন করোনার কারণে স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকায় দেশের মোট শিক্ষার্থীর ৯৪ ভাগ কোনো-না-কোনোভাবে ক্ষতির শিকার হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের ৯৯ ভাগই নিম্ন বা নিম্নমধ্য আয়ের পরিবারের সন্তান। বর্তমান পৃথিবী এমন এক বিপর্যয়ের শিকার, যার প্রভাব প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে পড়বে, মানবজাতির অন্তর্গত যে সম্ভাবনা রয়েছে তা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে, বিগত দশকগুলোর উন্নতির যে ধারা তা বাধাগ্রস্ত হবে। শিক্ষাগ্রহণ প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ সময় ব্যাঘাতের কারণে শিশুদের পুষ্টিহীনতা, শিশুশ্রম ও নারীর প্রতি সহিংসতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
অপুষ্টিতে ভুগছে শিশুরা

করোনায় বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার পাশাপশি স্বাস্থ্যসেবার অভিঘাত স্পষ্ট। কাজের সুযোগ ও আয় কমায় ক্রয়ক্ষমতা কমেছে অনেক পরিবারের। ক্রয়ক্ষমতা কমায় এসব পরিবারকে পুষ্টির বদলে খাদ্য নিরাপত্তার দিকেই মনোযোগী হতে হয়েছে বেশি। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে পরিবারের শিশুদের স্বাস্থ্যে। এছাড়া করোনা মহামারীর আগেও শিশুর পুষ্টি নিয়ে সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগ দৃশ্যমান ছিল। কিন্তু করোনায় সব থেমে যায়। এখন সব কিছু স্বাভাবিক হলেও চাহিদামতো সরকারি তেমন কোনো উদ্যেগ চোখে পড়ছেনা।
করোনাকালে শিশুর অপুষ্টি ও ওজনস্বল্পতা বাড়ার পেছনে বাল্যবিবাহের প্রবণতা বৃদ্ধির বিষয়টিকেও অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, করোনাকালে গ্রামাঞ্চলে বাল্যবিবাহের সংখ্যা বেড়েছে। বাল্যবিবাহের শিকার এসব নারীর গর্ভের শিশুও জন্ম নিচ্ছে অপুষ্টি ও ওজনহীনতাকে সঙ্গে করে। সামনের দিনগুলোয় বিষয়টি আরো জটিল রূপ নেয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশ একটি দুর্যোগ প্রবণ দেশ আর জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এখানে দুর্যোগের মাত্রা হয় আরো প্রকট। বন্যা বা ঘূর্ণিঝড় পানির উৎসগুলোকে দূষিত করে দেয়। তাই দুর্যোগের পরপরই অনেক শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং অপুষ্টিতে ভোগে।
বৃদ্ধি পেয়েছে শিশুশ্রম

২০২০-২১ সময়কালে চলমান করোনার আর্থ-সামাজিক, স্বাস্থ্যগত বিপদের মুখে শিশুশ্রম প্রতিরোধের বদলে লাফিয়ে বেড়েছে শিশুশ্রমের প্রথা। পরিবার-পরিজন হারিয়েছে লক্ষ লক্ষ শিশু। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হু হু করে বেড়েছে এতিম শিশু। যাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। শ্রমবাজারে কিংবা যৌনপল্লীতে পাচার হওয়ার বিপদ ঝুলছে এসব শিশুর ভাগ্যে।

করোনার কারণে লকডাউন শুরু হতেই বন্ধ হয়ে যায় দেশের সমস্ত স্কুল। বছর খানেক থমকে থাকে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা। তারপর অনলাইনে পড়াশোনার সুযোগ থাকলেও বঞ্চিত অধিকাংশ পড়ুয়া। সেইসঙ্গে হানা দেয় প্রবল আর্থিক সংকট। অভিভাবকদের অনেকেরই রোজগার বন্ধ হয়ে যায়। ক্ষুধার তাড়না মেটাতে পরিবারের সদস্যদের সাথে শিশুরাও ঝুঁকেছে বিভিন্ন কাজের দিকে।

আমাদের দেশে বর্তমানে ৩৪ লাখ ৫০ হাজার শিশু কর্মরত রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৭ লাখ ৫০ হাজার শিশু রয়েছে, যাদের কাজ শিশুশ্রমের আওতায় পড়েছে। বাকি শিশুদের কাজ অনুমোদনযোগ্য।

কর্মরত শিশুদের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত আছে ১২ লাখ ৮০ হাজার জন। আর ২ লাখ ৬০ হাজার শিশু অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করে। তাদের কাজের বৈশিষ্ট্য জীবন ও স্বাস্থ্যের জন্য বেশ হুমকি স্বরূপ। শিশুশ্রমের এ চিত্র উঠে এসেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক সমীক্ষায়।

দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে কী কী করণীয়?
শিক্ষার প্রাথমিক পর্যায়ে শতভাগ শিক্ষার্থীর অংশংগ্রহণকে সাফল্যের একমাত্র সূচক হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। কিন্তু এর বাইরেও আরও কিছু করণীয় রয়েছে। যেমনঃ-

১. শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা।
২. প্রাথমিক শিক্ষায় মজবুত ভিত্তি।
৩. মনিটরিং জোরদার করা ।
৪. শিক্ষার্থী ঝড়ে যাওয়া রোধ করতে বিশেষ উদ্যোগ।
৫. শিশু শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষা বন্ধ করা।
৬. গবেষণার পরিবেশ ও সুযোগ তৈরি।
৭. ১২-১৭ বছর বয়সি শিক্ষার্থীদের দ্রুত টিকা দিতে হবে
৮. শিক্ষার্থীদের স্কুলে টেনে আনা এবং বেশি সময় ধরে রাখার সৃজনশীল উপায় উদ্ভাবন।
৯. শিক্ষার মানোন্নয়নে অভিভাবকদের অসচেতনতা দূরীকরণ।

এছাড়াও আমাদের বিশেষ নজড় দিতে হবেঃ-

১. শিক্ষাক্ষেত্রে শৃঙ্খলা আনয়নে শিক্ষানীতি প্রণয়ন।
২. শিক্ষাখাতে বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধি।
৩. বিনামূল্যে শিক্ষার্থীদের পাঠ্যপুস্তক বিতরণ।
৪. কারিকুলাম সংস্কার, আধুনিক ও যুগোপযোগী সিলেবাস প্রণয়ন।
৫. পাঠ্যবইয়ে সঠিক ইতিহাস সংযোজন।
৬. সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি প্রণয়ন।
৭. পরীক্ষা কার্যক্রম সংস্কার।
৮. শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট ফান্ড গঠন।
৯. শিক্ষাক্ষেত্রে ই-বুক ও ডায়নামিক ওয়েবসাইট।
১০. যথাসময়ে পরীক্ষা গ্রহণ, ফল প্রকাশ ও ক্লাস শুরু।
১১. কোচিং বাণিজ্য বন্ধে নীতিমালা প্রণয়ন।
১২. কারিগরি শিক্ষার প্রসার।
১৩. মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকায়ন।
১৪. স্বতন্ত্র মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা ও
১৫. ভালো ফলাফলের পাশাপাশি শিক্ষার গুণ ও মানকে গুরুত্ব দেয়া।

আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষক, অভিভাবক, রাজনীতিবিদ, শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত অভিজ্ঞ সরকারি কর্মকর্তাসহ সবার সঙ্গে পরামর্শ করে বাস্তবসম্মত ও গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্ত নেয়াটাই উত্তম। তাহলেই ফিরে আসবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যাবস্থার সোনালী সময়।