ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:

মো: বজলুর রশীদ

৮ অক্টোবর ২০২১, ১৮:১০

তিউনিসিয়ায় ‘আরব বসন্তের’ দাফন

21076_8888.jpg
তিউনিসিয়ার মানুষ স্বপ্ন দেখে অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের। কিন্তু প্রেসিডেন্ট সাইদের ডন কিহোতে স্টাইলের ভাববিলাসী গবেষণায় মানুষের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হওয়ার উপক্রম। প্রেসিডেন্ট কায়েস সাইদ সাংবিধানিক আইনের অধ্যাপক ছিলেন। একজন অধ্যাপক হিসেবে তার সুনাম রয়েছে এবং দুর্নীতি বা গোষ্ঠীগত লাভজনক কাজের কোনো খতিয়ান নেই। তাই তিউনিসিয়ার লোকজন নিরপেক্ষ সৎ ব্যক্তি হিসেবে তাকে ভোট দেয়। পরবর্তীতে দেখা যায়, শক্তিশালী আননাহদা পার্টির পাঁচ-ছয় লাখ ভোট তার বাক্সে পড়েছে। সাইদ মনে করেন, তিউনিসিয়ায় তিনি একজন সর্বজন পছন্দনীয় ব্যক্তি, মানুষের এই আস্থার কারণে তিনি কিছু অভিনব সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক হয়ে তার রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দর্শনগুলোর পরীক্ষাগার হিসেবে নিজের দেশকে অসময়ে বেছে নিয়েছেন, যার ফলে জনগণের বিরাট এক অংশ তার বিরুদ্ধে ক্ষেপেছে।

প্রেসিডেন্ট কায়েস সাইদ দুই বছর আগে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত পার্লামেন্ট স্থগিত করেন, প্রধানমন্ত্রী হিশাম মাশিশিকে বরখাস্ত করে প্রধানমন্ত্রীর ইসলাম সমর্থিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করেন, ইসলামপন্থী নিয়ন্ত্রিত সংসদ স্থগিত করেন, দেশের সব নির্বাহী ক্ষমতা নিজের হাতে তুলে নেন, সংবিধানের কিছু অংশ স্থগিত করেন, নিজের ক্ষমতা বাড়িয়ে আদেশ জারি করেন। রাজনৈতিক দলগুলো এই আদেশকে ‘সাংবিধানিক অভ্যুত্থান’ বলে অভিহিত করেছে। অরাজক পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট কায়েস সাইদ কারফিউ জারি করে তিনজনের বেশি লোককে জমায়েত না হওয়ায় নিষেধাজ্ঞা জারি করেন, কিছু মন্ত্রী ও সরকারি কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করেন, কিছু রাজনৈতিক নেতাকে গৃহবন্দী করেন। বিচার বিভাগ দুর্নীতিতে জড়িত সন্দেহে সন্দেহপ্রবণ রাজনীতিবিদদের তালিকা করেন, চোরাচালান, অর্থ পাচার, কর ফাঁকি, রাষ্ট্রীয় প্রকল্পের দুর্নীতি ও ব্যক্তিকরণে সংসদ সদস্যদেরও তালিকা করা হয়। কিছু গভর্নর এবং অন্যান্য উচ্চপর্যায়ের রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাকে প্রতিস্থাপন করেছেন, যা মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত সাপেক্ষে গৃহীত একটি কাজ। এই পদক্ষেপগুলো স্থানীয় দুর্নীতি কাটিয়ে উঠতে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতাকে আরো বেশি সংহত করবে বলে তিনি মনে করেন। তিনি কিছু পণ্যের দাম কমানোর জন্য ইউনিয়ন অব রিটেইল স্টোরসের সাথে সহযোগিতা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন। তবে এই উদ্যোগ মুদ্রাস্ফীতি রোধ করার জন্য যথেষ্ট নয়।

এখন বেশির ভাগ মানুষ সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার চায় যাতে জীবন ধারণ সহজসাধ্য হয়। কিন্তু সাইদের কাজকর্ম এমন কোনো সংস্কার আনবে না মনে করা হচ্ছে। কেননা, রাজনীতিতে ‘এখন লাভ’ বলে কোনো কথা নেই। প্রজ্ঞা ও দেশপ্রেমের সাথে মেকিয়াভ্যালি-চাণক্যনীতির সমাবেশ হওয়া দরকার। ‘আমি ভালো মানুষ’ এমন কোনো থিওরি রাষ্ট্রবিজ্ঞানে নেই আর ক্যারিশমা সৃষ্টি দু-এক মাসের কাজ নয়। তার একক পরীক্ষা-নিরীক্ষাতে প্রচুর ব্যয় হচ্ছে এবং পরিশেষে তা ব্যর্থ হতে বাধ্য।

প্রেসিডেন্ট কায়েস সাইদ ২৫ জুলাই, সংসদ স্থগিত, প্রধানমন্ত্রীকে বরখাস্ত এবং সংবিধানের ৮০ অনুচ্ছেদ প্রয়োগ করে সংসদ সদস্যদের ইমমিউনিট দূর করার এই কাজগুলো দেশের ক্রমবর্ধমান সঙ্কটের সর্বশেষ পর্ব। যদিও রাষ্ট্রপতি সাইদ এবং তার অনুসারীরা বারবার এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন যে, তিনি ‘অভ্যুত্থান’ করেছেন, তারা বলেন যে সংবিধান তাকে আসন্ন হুমকির ক্ষেত্রে অসাধারণ ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা দিয়েছে। যাই হোক, এটা স্পষ্ট যে, সাইদের পদক্ষেপ শুধু ভুল ব্যাখ্যার উপর ভিত্তি করে নয়- সংবিধান অনুসারে, কিন্তু তার আর্টিকেল ৮০-এর প্রাথমিক সিদ্ধান্তগুলো সঠিক নয়। সংসদ স্থগিত করে পাবলিক প্রসিকিউশন এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাসহ সব নির্বাহী ক্ষমতা নিজের দখলে নেয়া স্বৈরশাসনের বীজ বপনের নামান্তর। সাইদের চাটুকার প্রিয়পাত্ররা এই কাজকে ‘অভ্যুত্থান’ বলে লেবেল সেঁটে দেয়া নিয়ে আপত্তি করে; কারণ তিনি ইতোমধ্যেই রাষ্ট্রপ্রধান রয়েছেন এবং তার কাজগুলো ছিল রক্তপাতহীন।

পরিকল্পনার অস্পষ্টতার কারণে তিউনিসিয়ার জেনারেল লেবার ইউনিয়নের (ইউজিটিটি) মতো কিছু সংগঠন, যারা প্রাথমিকভাবে রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছিল, তারা এখন একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা এবং আইনসভার নির্বাচনের সময়সূচি নির্ধারণের আহ্বান জানিয়েছে।
মহামারীজনিত মৃত্যু, দুর্নীতি এবং অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের প্রসারের কারণে হতাশার মধ্যেই সাইদের হস্তক্ষেপ আসে। এতে জনঅসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। বিদেশী মিত্ররাও প্রেসিডেন্ট কায়েস সাইদকে পার্লামেন্টারি গণতন্ত্র পুনর্বহালের আহ্বান জানান। রাজনৈতিক সফট ক্যুর কারণে শত শত তিউনিসিয়ান রাস্তায় বিক্ষোভ শুরু করে। সব মিলিয়ে ডিক্রি জারি করে ক্ষমতা দখল করা প্রেসিডেন্ট কায়েস সাইদ ও নতুন প্রধানমন্ত্রী নাজলা বুউদেন রমাদানকে বড় চ্যালেঞ্জে ফেলে দিয়েছে। নতুন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের পর সাইদ বলেন, ‘আমরা দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোতে যে দুর্নীতি ও বিশৃঙ্খলা নিয়ে এসেছি তা শেষ করতে কাজ করব... আমরা অনেক সময় নষ্ট করেছি।’ সাইদ প্রধানমন্ত্রী রমাদানকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একটি সরকার গঠন করতে বলেছেন। এ দিকে ভেঙে দেয়া পার্লামেন্টের অধিবেশন ডাকার তোড়জোড় শুরু হয়েছে। ৬৫ বছর বয়সী মহিলা হঠাৎ করে রাজনৈতিক চাপ সহ্য করতে না পারলে তিনি হয়তো ইস্তফাও দিতে পারেন। তখন সঙ্কট আরো একদিকে মোড় নেবে।

২০১১ সালের বিপ্লব পরবর্তী সময়ে ব্যক্তি স্বাধীনতা এগিয়ে গেছে কিন্তু স্থানীয় দুর্নীতি বা অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানে কোনো অগ্রগতি হয়নি, কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে অর্থনৈতিক মন্দা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে, দুর্নীতি ও মুদ্রাস্ফীতি সমানতালে চলতে থাকে। সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, বেকারত্ব দূর করা বিশেষ করে তরুণদের আশা ধুলায় ধূসরিত হয়েছে। এ জন্য সব দল এমন কি আননাহদার সদস্যরাও নিজের দলের নেতৃত্বকে দায়ী করেছে।

লক্ষ্য করার বিষয়, সাইদ এর আগে কখনো কোনো রাজনৈতিক দলের অংশ ছিলেন না। জনসাধারণের সমর্থন নিশ্চিত করতে তার কোনো কার্যকর রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম নেই। কিছু পণ্ডিত অনুমান করেছিলেন, তিনি শিগগিরই তার নিজের দল তৈরি করবেন, কিন্তু এটি হওয়ার সম্ভাবনাও কম।

সাঈদ বেশ আগে প্রকাশ করেন, রাজনৈতিক দলগুলোর উপর ভিত্তি করে একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার ধারণাকে তিনি সামনে নিয়ে আসতে পারেন। এ মুহূর্তে ক্ষমতা হাতছাড়া করার কোনো ইচ্ছা তার নেই। তিনি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিকেন্দ্রীকরণের জন্য ‘কাউন্সিলিজম’ নামে একটি বামপন্থী ধারার কথা বলেছেন যার মাধ্যমে স্থানীয় কাউন্সিলগুলোকে রাজনৈতিক ব্যবস্থার মৌলিক স্তম্ভ হিসেবে গড়ে তোলা যায়। তৃণমূল নেতারা সবসময় ক্ষমতা পেলেই সাধারণত সন্তুষ্ট থাকে; সাইদ সেটি লক্ষ করে বেশি সমর্থন আদায়ের কৌশল হিসেবে এই কাজ করতে চান। তিনি এমন এক তরীতে উঠেছেন যা সাগরের উর্মিমালায় দুদোল্যমান।

আননাহদার এখন ত্রাহি অবস্থা। চলমান রাজনৈতিক সঙ্কটের মধ্যেই দেশটির স্থগিত পার্লামেন্টের বৃহত্তম দল আননাহদার ১১৩ সদস্য পদত্যাগ করেছেন। প্রেসিডেন্ট কায়েস সাইদের অভ্যুত্থান চেষ্টার মোকাবেলায় দলের ব্যর্থতার জন্য তারা পদত্যাগ করেন। পদত্যাগী নেতারা আননাহদার ব্যর্থতা ও ঘানুশির অযোগ্যতা বলে মনে করেন এবং রশিদ ঘানুশিকেও পদত্যাগের আহ্বান জানান। ঘানুশি পার্লামেন্টের স্পিকার। ২০১১ সালে আরব বসন্তের পর তিউনিসিয়ায় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসেবে আননাহদার আবির্ভাব ঘটে। পার্লামেন্টে দলটির বৃহত্তম অংশীদারিত্ব থাকলেও সরাসরি সরকার গঠনে না থেকে বিভিন্ন দলের সমন্বয়ে সরকারকে পেছন থেকে সমর্থন দিয়ে আসায় নেতৃত্বকে এবং ঘানুশিকে দায়ী করা হচ্ছে। তিউনিসিয়ার রাজনৈতিক দলগুলো স্বৈরাচারী শাসন ফিরে আসার শঙ্কা করেছেন এবং ২০১১ সালে যে বিক্ষোভের ফলে বেন আলী দেশত্যাগ করেছিলেন সেই অবস্থা ফিরে এসেছে বলে প্রচার করছেন। বলা হচ্ছে, ‘আরব বসন্তের সূতিকাগারেই তার কবর তৈরি হয়েছে’।

তিউনিসিয়া রাজনৈতিক আবর্তে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েছে। একই সাথে রাজনীতি এবং সরকারে ধর্মের ভ‚মিকা ও সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক দিন দিন জটিল আকার ধারণ করছে। ‘ইসলামী রাজনীতি ব্যর্থ হয়েছে এবং এ জন্য ঘানুশি ও আননাহদা দায়ী’ বলে বলা হচ্ছে। তা সত্তে¡ও, প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা কুক্ষীগতকরণ প্রত্যাখ্যান করে পার্লামেন্টের ২১৭ জন সদস্যের এক-তৃতীয়াংশ চলতি অক্টোবরে পার্লামেন্ট অধিবেশন আবার শুরু করার জন্য স্পিকার রশিদ ঘানুশির প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

সাঈদের বর্তমান রাজনৈতিক পদক্ষেপে আন্তর্জাতিক কোনো বৈধতা নেই। তার ক্ষমতায় থাকার এক অক্ষ হলো স্বৈরতন্ত্রের আরব অক্ষ, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং মিসর; দ্বিতীয় অক্ষ হলো পশ্চিমা সমর্থন ও সহায়তা। তিনি আবুধাবী, রিয়াদ ও কায়রোর সহায়তা লাভের জন্য আলজাজিরার সব অফিস বন্ধ করে দিয়েছেন। অতঃপর তিনি লিবিয়া সীমান্ত সিল করে দিয়েছেন। তিউনিসিয়ার সাথে চীন, ইতালি ও তুরস্কের একই রকম বাণিজ্য চুক্তি থাকলেও শুধু তুরস্কের চুক্তি রিভিউ করার নির্দেশ দিয়েছেন। তা ছাড়া তিনি আননাহদার প্রতি অনেকটা নিরুৎসাহিত হয়েছেন তাই অনেক আগের রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডকে তাদের কাজ এমন অভিযোগ এনে রাজনীতি থেকে দলকে নির্বাসন দেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন। এমনকি তিউনিসের কাসেরিন শহরে জুমার খুতবায় তালেবানের ভূয়সী প্রশংসা করায় খতিবকে গ্রেফতার করে সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ আদালতে সোপর্দ করেছেন। দেশের ভেতর ও আন্তর্জাতিকভাবে চাপে পড়া প্রেসিডেন্ট, মন্ত্রিসভার প্রধান হওয়ার জন্য নিজের হাতে বিশাল নির্বাহী ক্ষমতা রেখেছেন। বছরের পর বছর অর্থনৈতিক স্থবিরতার পর একটি দুর্নীতিগ্রস্ত ও অজনপ্রিয় রাজনৈতিক দলকে অপসারণের জন্য অনেকে খুশি হলেও সা¤প্রতিক পদক্ষেপে রাজনৈতিক দলগুলোর জোট ‘নাগরিক ফ্রন্টের’ চরম বিরোধিতা তিনি কিভাবে ঠেকাবেন তার কোনো আভাস আপাত দৃষ্টিতে দেখা যাচ্ছে না।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব ও গ্রন্থকার