ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:

রুবেল আহমেদ

২৩ আগস্ট ২০২১, ২২:০৮

কারবালার যুদ্ধ: ইয়াজিদের শেষ পরিণতি

20101_34-3.jpg
কারবালার যুদ্ধ

কারবালার যুদ্ধ ইসলামিক পঞ্জিকা অনুসারে ১০ মুহাররম ৬১ হিজরী মোতাবেক ১০ অক্টোবর ৬৮০ খ্রিষ্টাব্দে বর্তমান ইরাকের কারবালা নামক প্রান্তরে সংগঠিত হয়েছিল। এই যুদ্ধটি হযরত মুহাম্মদ (স) এর নাতি হোসাইন ইবনে আলী ও তার অল্প কিছু সমর্থক-আত্মীয় এবং উমাইয়া খলিফা প্রথম ইয়াজিদের বিশাল সেনাবাহিনীর মধ্যে সংগঠিত হয়। এই যুদ্ধে হোসাইন এবং তার ছয় মাস বয়সী শিশুপুত্র আলী আল-আসগরসহ সকল সমর্থক নিহত হয় ও নারী এবং শিশুরা বন্দি হন। মুসলমানদের মতানুসারে নিহতদের সকলে 'শহীদ' হিসেবে অভিহিত হন এবং এই যুদ্ধ শিয়া মতাবলম্বীদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের কেন্দ্রস্থলে অবস্থান করে।
 
৬০ হিজরিতে ইরাক বাসীদের নিকট সংবাদ পৌঁছল যে, হুসাইন (রাঃ) ইয়াজিদ বিন মুয়াবিয়া হাতে বায়আত করেন নি। তারা তাঁর নিকট চিঠি-পত্র পাঠিয়ে জানিয়ে দিল যে ইরাক বাসীরা তাঁর হাতে খেলাফতের বাইয়াত নিতে আগ্রহী। ইয়াজিদকে তারা সমর্থন করেন না বলেও সাফ জানিয়ে দিল।
 
প্রকৃত অবস্থা যাচাই করার জন্য হুসাইন (রাঃ) তাঁর চাচাতো ভাই মুসলিম বিন আকীলকে কুফায় পাঠালেন। মুসলিম গিয়ে দেখলেন, আসলেই লোকেরা হুসাইনকে চাচ্ছে। লোকেরা মুসলিমের হাতেই হুসাইনের পক্ষে বাইয়াত নেওয়া শুরু করল।
 
সিরিয়াতে ইয়াজিদের নিকট এই খবর পৌঁছা মাত্র বসরার গভর্ণর উবাইদুল্লাহ বিন যিয়াদকে পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য পাঠালেন। উবাইদুল্লাহ কুফায় গিয়ে পৌঁছলেন। তিনি বিষয়টি তদন্ত করতে লাগলেন এবং মানুষকে জিজ্ঞেস করতে শুরু করলেন। পরিশেষে তিনি নিশ্চিত হলেন যে, হানী বিন উরওয়ার ঘরে হুসাইনের পক্ষে বাইয়াত নেওয়া হচ্ছে।
 
অতঃপর মুসলিম বিন আকীল চার হাজার সমর্থক নিয়ে অগ্রসর হয়ে দ্বিপ্রহরের সময় উবাইদুল্লাহ বিন জিয়াদের প্রাসাদ ঘেরাও করলেন। এ সময় উবাইদুল্লাহ বিন যিয়াদ দাঁড়িয়ে এক ভাষণ দিলেন। তাতে তিনি ইয়াজিদের সেনা বাহিনীর ভয় দেখালেন। তিনি এমন ভীতি প্রদর্শন করলেন যে, লোকেরা ইয়াজিদের ধরপাকড় এবং শাস্তির ভয়ে আস্তে আস্তে পলায়ন করতে শুরু করল। উবাইদুল্লাহ বিন যিয়াদ মুসলিম বিন আকীলকে হত্যার আদেশ দিলেন। মুসলিম বিন আকীল উবাইদুল্লাহএর নিকট আবেদন করলেন, তাকে যেন হুসাইনের নিকট একটি চিঠি পাঠানোর অনুমতি দেয়া হয়। এতে উবাইদুল্লাহ রাজী হলেন। চিঠির সংক্ষিপ্ত বক্তব্য ছিল এ রকম:
 
“হুসাইন! পরিবার-পরিজন নিয়ে ফেরত যাও। কুফা বাসীদের ধোঁকায় পড়ো না। কেননা তারা তোমার সাথে মিথ্যা বলেছে। আমার সাথেও তারা সত্য বলেনি। আমার দেয়া এই তথ্য মিথ্যা নয়।
 
যিলহজ্ব মাসের ৮ তারিখে হুসাইন (রাঃ) মক্কা থেকে কুফার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছিলেন। যাত্রা পথে হুসাইনের কাছে মুসলিমের সেই চিঠি এসে পৌঁছল। চিঠির বিষয় অবগত হয়ে তিনি কুফার পথ পরিহার করে ইয়াজিদের কাছে যাওয়ার জন্য সিরিয়ার পথে অগ্রসর হতে থাকলেন। পথিমধ্যে ইয়াজিদের সৈন্যরা আমর বিন সাদ, সীমার বিন যুল জাওশান এবং হুসাইন বিন তামীমের নেতৃত্বে কারবালার প্রান্তরে হুসাইনের গতিরোধ করল।
 
 
ইয়াজিদের শেষ পরিণতি

ইমাম হোসাইনের শাহাদাতের ঘটনার মূল নায়ক ইয়াজিদ। ইয়াজিদের নির্দেশেই কারবালা প্রান্তরে ইমাম হোসেনকে শহীদ করা হয়। কারবালার যুদ্ধের পর মুসলিম দুনিয়ায় বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠলো। বিশেষ করে মক্কা-মদীনার অধিবাসীগণ ইয়াজিদের এহেন কুকর্মের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করতে লাগল। ইতোমধ্যে ইয়াজিদ বাহিনী মক্কা-মদীনা আক্রমণ করে বহুসংখ্যক লোককে শহীদ করল। ইয়াজিদ এক অজ্ঞাত রোগে মারা যায়। তার অনুসারীরা রাতের আঁধারে অজ্ঞাত স্থানে তাকে কবর দিয়েছিল। আজ পর্যন্ত কেউ ইয়াজিদের কবরের সন্ধান পায়নি।
 
ইসলামে ইয়াজিদ একমাত্র খলিফা যার দ্বারা ইসলাম সবচেয়ে বেশি অবদমিত হয়েছে। ৬৮০ সালের মে মাসে ক্ষমতা গ্রহণের চার মাসের মাথায় শুরু করে যুদ্ধ । কারবালার যুদ্ধ। হত্যা করে শেষ নবীর প্রিয় নাতি ইমাম হোসাইনকে। এরপর দ্বিতীয় বছরে আক্রমণ করে মদিনা। লন্ডভন্ড করে দেয় মসজিদে নববী। আর জীবনের শেষ বছরে এসে ইয়াজিদ আগুন লাগিয়ে দেয় মুসলমানের সবচেয়ে পবিত্র স্থান কাবা ঘরে। এই তিন বড় অপরাধের জন্য মুসলমানদের কাছে ইয়াজিদ এক ঘৃণিত ব্যক্তিতে পরিনত হয় ।
 
কাবা ঘরে আগুন লাগানোর ১১ দিনের মাথায় রহস্যজনক ভাবে মৃত্যূ হয় ইয়াজিদের। শেষ হয় তার তিন বছর নয় মাসের ক্ষমতা। সময়টা ১২ নভেম্বর ৬৮৩ । ইসলাম মুক্ত হয় এক জালেম শাসকের হাত থেকে ।
 
কিভাবে মৃত্যু হলো ইয়াজিদের? 
 
এই নিয়ে আছে নানা মত। তার মৃত্যুর অনেক কয়েকটি কারন সন্দেহ করা হয় :

বিরল রোগ :

কারবালার ঘটনার পর এক বিরল রোগে আক্রান্ত হয় ইয়াজিদ। অজানা এই রোগের কোনো ধরনের চিকিৎসা দিতে পারেনি চিকিৎকেরা। কেউ কেউ বলে এসময় তিনি প্রচন্ড পানির তৃষ্ণায় ভুগতেন কিন্তু পানি দিলেই খেতে পারতেন না সেই পানি।এমনভাবে যন্ত্রনায় ছটফট করতে করতে পানির তৃষ্ণায় শেষ পর্যন্ত মারা যায় ইয়াজিদ।

. ঘোড়া থেকে পড়ে :

ঘোড়া থেকে পড়ে মৃত্যু হয় ইয়াজিদের। ডাক্তারের পরামর্শে তার প্রিয় বানরকে নিয়ে শিকারে বের হয়েছিল ইয়াজিদ। হঠাৎ বানরটি হারিয়ে গেলে তাকে খুঁজতে এক গহীন পাহাড়ে গিয়ে পৌঁছায়। এমনসময় ঘোড়া থেকে পড়ে যায় ইয়াজিদ কিন্তু ছুটন্ত ঘোড়া আর না থেমে আরো দ্রুত ছুটতে থাকে। তার শরীর ঘোড়ার সাথে বাঁধা থাকায় পাথরের আঘাতে মৃত্যু বরণ করে ইয়াজিদ। আর ঘোড়াটি অস্বাভাবিকভাবে ছুটতে থাকায় ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যায় ইয়াজিদের শরীর ।

হত্যা :

কারো কারো মতে হত্যা করা হয়েছে ইয়াজিদকে । একদিন তার প্রিয় বানর খুঁজতে গিয়ে তিনি পাহাড়ের গহীনে হারিয়ে যান। সেখানে এক অপরিচিত লোকের সাথে তার দেখা হয় । তৃষ্ণার্ত ইয়াজিদ তার কাছে পানি চাইলে, লোকটি তার পরিচয় জানাতে চায়। পরিচয় জানার পর ইয়াজিদকে তিনি আর পানি দেন না । ইমাম হোসাইনের হত্যাকারীকে চিনতে পেরে শাস্তিস্বরুপ সেখানেই হত্যা করেন ইয়াজিদকে। ইসলাম বিশ্বাসী অনেকে মনে করেন সেই অপরিচিত লোকটি ছিল আল্লাহ প্রেরিত কোন দূত।
 
এছাড়া হত্যার আরো একটি কারণ অনুমান করা হয় ইয়াজিদ রোমান বংশোদ্ভুত এক যুবতী মহিলার প্রেমে পড়েছিল। সেই মহিলার হাতে নির্জন এক মরুভুমিতে খুন হয়েছিল ইয়াজিদ। সেখানে তার শরীর পশুপাখির খাদ্য হয়েছিল।
 
তবে ইতিহাসবিদের মতে প্রথম ও তৃতীয় কারণটিই ইয়াজিদের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মৃত্যুর কারণ হিসেবে ধরা হয়।
 
ইয়াজিদের মৃত্যুর পর ছেলে মুয়াবিয়া ক্ষমতায় আসে ২১ বছর বয়সে। তিন মাসের মধ্যেই মারা যান তিনি। শেষ হয় উমাইয়াদের শাসনামল। শেষ হয় ইসলামের এক ঘোরতর অন্ধকারের যুগ।