ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:

সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা

১১ জুলাই ২০২১, ০৭:০৭

বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস

জনসংখ্যা ও মানবসম্পদ

19168_PPP.jpg
আজ ১১ জুলাই বিশ^ জনসংখ্যা দিবস। বিশে^র বিভিন্ন দেশের মত আমাদের দেশেও বিদসটি যথাযথ মর্যাদায় পালিত হচ্ছে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা বৈশি^ক বোঝা এবং এথেকে পরিত্রাণের কর্মকৌশল নির্ধারণ ও গণসচেতনা সৃষ্টির জন্যই এই দিবস পালন করা হয়। দিবসটির লক্ষ্য বিশ্ব জনসংখ্যা সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্নের উপওে সচেতনতা বৃদ্ধি। ১৯৮৭ সালের ১১ই জুলাই বিশ্ব জনসংখ্যা ৫শ কোটি ছাড়িয়ে গেলে সারা বিশ্বের মানুষের মধ্যে যে আগ্রহ বা উদ্বেগের সৃষ্টি হয়, তা প্রশমনের জন্যই ১৯৮৯ সালে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির পরিচালনা পরিষদ এই দিবসটি প্রতিষ্ঠা করে। মূলত, বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসের লক্ষ্য হলো পরিবার পরিকল্পনা, লৈঙ্গিক সমতা, দারিদ্র্য, মাতৃস্বাস্থ্য এবং মানবাধিকারের মতো জনসংখ্যা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি। আর সে থেকে দিবসটি প্রতিবছরই বেশ ঘটা করে পালিত হয়ে আসছে।
ক্রমবর্ধমান ধারায় বৈশি^ক জনসংখ্যা এখন প্রায় ৮শ কোটিতে পৌঁছেছে। এটি ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়ে ২০৩০ সালে ৮৫০ কোটি, ২০৫০ সালে ৯৭০ কোটি এবং এবং ২১০০ সালে গিয়ে ১০৯০ কোটিতে পোঁছাতে পারে বলে অনুমান করছে জাতিসংঘ। ২০৫০ সালের মধ্যে যে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাবে, তার অর্ধেকের বেশি বৃদ্ধি হবে ৯টি দেশে; দেশগুলো হল ভারত, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র, ইথিওপিয়া, তানজানিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মিশর এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৭ সাল নাগাদ ভারত চীনকে ছাড়িয়ে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল রাষ্ট্রে পরিণত হবে। এমনটিই ধারণা করছেন আন্তর্জাতিক জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞরা।
জনসংখ্যার বৃদ্ধির এ ধারা থেকে আমাদের দেশও আলাদা নয়। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার বেশ বেশি। সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছে, করোনা মহামারী শুরুর পর স্বাস্থ্যসেবায় ধস নেমেছে। সঙ্গত কারণেই দেশে স্বল্পমেয়াদি পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণ কমে গেছে ২৫ শতাংশ। দীর্ঘমেয়াদি পদ্ধতি গ্রহণ নেমে এসেছে অর্ধেকেরও নিচে। এ সময়ে নারী ও কিশোরীদের সুস্বাস্থ্যের অধিকার নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারও খানিকটা বেড়েছে এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে এমনটিই দাবি করা হয়েছে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে।
এমন পরিস্থিতিতেই বিশে^র অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও আজ বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস পালিত হতে হচ্ছে। দিবসটি উপলক্ষে জনসংখ্যা ও উন্নয়নবিষয়ক বক্তৃতা, র‌্যালি, অনলাইন সেমিনার ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোভিড-১৯ পরিস্থিতি চলমান থাকলে এবং লকডাউন পরিস্থিতি যদি আরও ছয় মাস দীর্ঘ হয় তাহলে নিম্ন-মধ্যম ও নিম্ন আয়ের ১১৪ দেশে ৪৭ মিলিয়ন নারী আধুনিক জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি থেকে বঞ্চিত হবেন। আর অতিরিক্ত ৭ মিলিয়ন নারী গর্ভধারণ করবেন। প্রতিবেদন অনুসারে, কোভিড-১৯ পরিস্থিতি বাল্যবিবাহের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। বিশ্বে ১৩ মিলিয়ন বাল্যবিবাহ হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। এর মধ্যে ৮ মিলিয়ন বাল্যবিবাহ হবে শুধু বাংলাদেশে। যেখানে বাল্যবিবাহের হার ৫০ শতাংশেরও বেশি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, লকডাউন পরিস্থিতি ও মায়েদের মধ্যে করোনাভীতির কারণে ফ্যামিলি সার্ভিস সিস্টেম ব্যাহত হচ্ছে। তাদের পারসেপশন ও ট্রাভেল করতে না পারা একটি বড় কারণ। এ ছাড়া সুবিধা প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও সমস্যা রয়েছে। যেমন, ডাক্তারা বলছেন, তারা যদি মানসম্মত পিপিই না পান তাহলে তারা যথাযথভাবে সার্ভিস দিতে পারবেন না। কারণ, কে কোভিড-১৯ পজিটিভ, আর কে নেগেটিভ-তা নির্ধারণ করা কঠিন। তাই ধরেই নিতে হয় যে, সবার কোভিড-১৯ পজিটিভ। এমন প্রতিকূলতার মধ্যেই সচেতনতার সঙ্গে সেবা দিতে হচ্ছে। কিন্তু এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা খুবই অপ্রতূল। দাবি সংশ্লিষ্টদের।
সরকারের হেলথ ইনফরমেশন সিস্টেমের ডেটা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাড়ি বাড়ি গিয়ে সরকারি স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা যে সেবাটি দিতেন তা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অধিকাংশ বাড়িতেই সবাইকে প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না। আবার কোথাও কর্মীরাও যাচ্ছেন না। গত বছরের এ সময়ের তুলনায় চলতি বছরের এ সময়ে স্বল্পমেয়াদি পরিবার পরিকল্পনা সিস্টেম ২৫ শতাংশ কমে গেছে। আর দীর্ঘমেয়াদি পরিবার পরিকল্পনা কমেছে ৫০ শতাংশের বেশি। দেশে পরিবার পরিকল্পনার পদ্ধতিগত কোনো দুর্বলতা ও স্বল্পতা নেই বলে দাবি করা হয়। কিন্তু সার্ভিস প্রোভাইডররা বাড়ি বাড়ি গিয়ে সেবা দিতে না পারায়, কোনো ক্ষেত্রে না যাওয়ায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
ইউএনএফপিএ-র বার্ষিক বৈশ্বিক জনসংখ্যা প্রতিবেদন ২০১৯-এ বলা হয়েছে, ৫০ বছরে দেশের জনসংখ্যা বেড়েছে ১০ কোটি ৪৭ লাখ। বছরে ১ দশমিক ১ শতাংশ হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। মানুষের গড় আয়ু ৭৩ বছর। এতে আরও বলা হয়েছে, দেশে ৫০ শতাংশ মা প্রসবের সময় দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর সেবা পান না। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ সবচেয়ে বেশি। চাহিদা থাকার পরও ১১ শতাংশ নারী প্রয়োজনের সময় জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী পান না।
বিষয়টি নিয়ে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের বক্তব্য হচ্ছে, ‘করোনা পরিস্থিতির কারণে পরিবার পরিকল্পনার স্থায়ী ও দীর্ঘমেয়াদি পদ্ধতি বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। কারণ, এ ক্ষেত্রে কিছুটা সার্জিক্যাল বিষয় আছে। আর অনেকেই ঝুঁকি নিয়ে ক্লিনিকগুলোয় আসতে চান না। তবে আমাদের ক্লিনিকগুলো খোলা রয়েছে। যারা সেখানে আসছেন, তারা সেবা পাচ্ছেন’।
অধিদপ্তরের পক্ষে আরও বলা হয়েছে, ‘আমরা নরমাল পদ্ধতিকে রেগুলার করতে পারলেও স্থায়ী ও দীর্ঘমেয়াদি পদ্ধতি রেগুলার করতে পারছি না। এ ছাড়া আমাদের অধিদফতরের যত কর্মী রয়েছেন, সে অনুসারে সুরক্ষাসামগ্রীরও অপর্যাপ্ততা রয়েছে। কয়েকজন কর্মকর্তা করোনায় আক্রান্তও হয়েছেন। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি’।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের তথ্যানুসারে, দেশে বর্তমানে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১ দশমিক ৩৭ শতাংশ। এক বছরের কম বয়সী শিশুর মৃত্যুহার (প্রতি হাজার জীবিত জন্মে) ১৬ এবং মাতৃমৃত্যু হার ১ দশমিক ৬৯ শতাংশ। সক্ষম দম্পতিদের মধ্যে বর্তমানে ৭৭ দশমিক ৯৬ শতাংশ দম্পতি পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণ করে।
সূত্র জানায়, দেশে এখনও অনেক ক্ষেত্রে পরিবার থেকে কন্যাশিশুর বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এমনকি বিয়ের পর সন্তান নেয়ার ক্ষেত্রেও তাদের কোনো ভূমিকা থাকে না। এসবের কারণে একদিকে বাল্যবিবাহ, সন্তান নেয়া, মাতৃমৃত্যু, নবজাতকের মৃত্যু ইত্যাদি ক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে এটি মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
এখন থেকে ৫২ বছর আগে মানবাধিকার সংক্রান্ত প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলনে পরিবার পরিকল্পনাকে একটি মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। ১৯৬৯ সালের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের স্মারক ২৫৪২(১৯) ধারার ৪ উপধারায় বলা হয়, বাবা-মা মুক্ত ও স্বাধীনভাবে সন্তান নেয়া এবং বিরতির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। ১৯৯৪ সালে কায়রোয় অনুষ্ঠিত জনসংখ্যা ও উন্নয়ন সংক্রান্ত অন্তর্জাতিক সম্মেলনের ঘোষণাপত্রের ধারা ৮-এ বলা হয়, সন্তান সংখ্যা, দুই সন্তানের মাঝে বিরতি দেয়ার বিষয়টি ব্যক্তির অধিকার।
এমতাবস্থায় জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) এ বছর বিশ্বব্যাপী করোনা যুদ্ধের সম্মুখসারিতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী নারীদের অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি দিয়েছে, একই সাথে সমগ্র পৃথিবীতে সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়ার কারণে অনাকাঙ্খিথ গর্ভধারণ এবং লক-ডাউনের কারণে নারীদের অপারিশ্রমিক কর্মপরিধি বৃদ্ধি, মাতৃস্বাস্থ্যসেবার ব্যত্যয়সহ লিঙ্গভিত্তিক নির্যাতনের প্রকোপ বৃদ্ধির আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।
বিশ^ জনসংখ্যা দিবস পালনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নানাবিধ হলেও প্রধান উদ্দেশ্য হলো ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ। আর অন্যগুলো কিছুটা হলেও গৌণ। কিন্তু মানুষ শুধু ক্ষুধার্ত পেট নিয়েই জন্মায় না বরং তার সাথে বলিষ্ঠ দু’টো হাতও থাকে। তাই শুধু বৈশি^ক জন্মহার নিয়ন্ত্রণ নয় বরং ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যাকে মানবসম্পদে পরিণত করা দরকার।
মূলত, টেকসই উন্নয়নে পরিকল্পিত ও দক্ষ জনসংখ্যার গুরুত্ব অপরিসীম। বর্তমানে কোভিড-১৯ কে ভয় না করে সকলকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কোন বিকল্প নেই। বিশেষ করে মহামারির এ সময় গর্ভবতী নারী সন্তান প্রসব-পূর্ববর্তী ও প্রসব-পরবর্তী সেবা যাতে ঠিকমতো পায় তা সবার আগে নিশ্চিত করতে হবে। আর বর্দ্ধিত জনসংখ্যাকে কর্মে হাতিয়ারি পরিণত করতে পারলেই বিশ^ জনসংখা দিবস পালন সফল ও সার্থক হয়ে উঠবে। অন্যথায় কোন প্রচেষ্টায় ফলপ্রসূ হবে না।