ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:

সালাহউদ্দীন কাদের

৬ জুলাই ২০২১, ১৭:০৭

নদী ভাঙন রোধে চাই কার্যকর পদক্ষেপ

19049_8.jpg
সংগৃহীত
নদী ভাঙন একটি সর্বগ্রাসী দুর্যোগ। বাংলাদেশে এটি নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যান্য দুর্যোগে বেশ ক্ষয়ক্ষতি হলেও মাথা গোজার জায়গাটুকু থাকে। কিন্তু, নদী ভাঙনের ক্ষয়ক্ষতি ধীরে ধীরে হলেও অন্যান্য দূর্যোগ থেকে অধিক ধংসাত্মক এবং কেড়ে নেয় বসতি ও চাষের জমি। প্রতি বছর নদী ভাঙনের ফলে হাজার হাজার হেক্টর জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে । প্রতি বছর নদী ভাঙনের ফলে লাখ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত ও বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। একটি হিসাবে দেখা যায়, বাংলাদেশের মোট প্লাবনভূমির প্রায় ৫ শতাংশ প্রত্যক্ষভাবে নদীভাঙনের শিকার।

নদী ভাঙনের কারণ

নদী ভাঙনের কারণ প্রাকৃতিক এবং মানবসৃষ্ট দুটি হতে পারে।

প্রাকৃতিক কারণে ভাঙন

বাংলাদেশ একটি পলি গঠিত ব-দ্বীপ ভূমি হওয়ায় এখানকার ভূমি নদীর পানির ধাক্কায় বা সামান্য তোড়ে অতি সহজেই ভেঙে যায় এবং মাটির গঠন দুর্বল বিধায় সামান্য চাপ বা আঘাতে নদীর পাড়ে ভাঙন হয়ে থাকে। এছাড়াও দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অকস্মাৎ বন্যার প্রভাবে অতি দ্রুত গতির বা আকস্মিক নদী ভাঙন হয়ে থাকে।

মানবসৃষ্ট কারণে ভাঙন

বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর মাঝখানে আড়াআড়ি বাঁধ নির্মাণ করে নদীর গতি রুখতে চেষ্টা করার ফলে পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হিসাবে ভাঙন হয়ে থাকে। অযৌক্তিক ড্রেজিং বা নদী খননের ফলেও নদী ভাঙনের সৃষ্টি হয়ে থাকে। এছাড়াও স্লুইস গেট নির্মাণ করে পানি নিয়ন্ত্রণের নামে পানি আটকে দেয়ার ফলে পানির চাপ বৃদ্ধির কারণে নদীর পাড়ে ভাঙন হয়ে থাকে।

নদী ভাঙন এলাকা

চলতি বছরে বেশকিছু এলাকায় ব্যাপক নদী ভাঙন লক্ষ্য করা যাচ্ছে । বিশেষ করে জুন মাস থেকে সিরাজগঞ্জে যমুনায় পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভয়াবহ নদীভাঙন শুরু হয়েছে। পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে কাজিপুর, শাহজাদপুর ও চৌহালী উপজেলায় তীব্র নদী ভাঙন দেখা গেছে। গত এক মাসে ভাঙনে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে তিন শতাধিক বসতভিটা, একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিস্তীর্ণ ফসলি জমি।

এছাড়া দক্ষিানাঞ্চলের শরিয়তপুর , চাঁদপুর , মাদারীপুরের শিবচর এবং ভোলার কিছু জায়গায় নদী ভাঙন দেখা দিয়েছে ।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের দেয়া তথ্যমতে, চলতি বছর প্রায় ২ হাজার ৮০০ হেক্টর এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হতে পারে। যা ২০২০ সালের তুলনায় অন্তত ৪০০ হেক্টর বেশী।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যানুযায়ী আরো জানা যায় ,গত এক যুগ ধরে ধারাবাহিকভাবে নদীভাঙন কমে আসছে। একসময় তীব্র নদীভাঙনের কবলে পড়া অনেক গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ভাঙন অনেক কমে গেছে। ২০১১ সালে দেশে বছরে ৬ হাজার ৬০০ হেক্টর এলাকা নদীভাঙনের শিকার হয়েছিল। ২০১৮ সালে তা কমে ৩ হাজার ২০০ হেক্টরে নেমে আসে। ২০১৯ সালে তা আরো কমে ২ হাজার ৬০০ হেক্টরে নেমে আসে।

সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) নামের এই গবেষণা সংস্থার তথ্য মতে, এ বছর অন্তত ১৩টি জেলায় যমুনা, গঙ্গা ও পদ্মা নদীর ভাঙন তীব্র হবে।

নদী ভাঙন রোধে সরকারের ভূমিকা

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের হিসেব অনুযায়ী, প্রতি বছর চার দফায় বন্যায় সারাদেশে ৩৩৪ উপজেলায় ৬৬ শতাংশ বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ থেকে বুঝা যাচ্ছে সরকার অতীতে যে সব প্রকল্প হাতে নিয়েছে তা অনেক ক্ষেত্রে টেকসই হচ্ছে না।

এ ব্যাপারে নদী বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত বলেন, সঠিক পরিকল্পনার অভাবে নদী ভাঙন কমানো যাচ্ছে না। নদী চলবে তার নিজস্ব গতিতে, তবে মানুষের ক্ষতি করে, এমন নদীর গতি পথ পালটে দেয়া এবং শাসন করা যেতে পারে। এই প্রক্রিয়া বেশ ব্যয় বহুল বলে সরকার এই পথ এড়িয়ে চলে।

তবে পানি সম্পদ উপমন্ত্রী এনামুল হক শামীম জানান, সনাতন পদ্ধতির পরিবর্তে নদী ভাঙন রোধে বেশ কিছু স্থায়ী প্রকল্প হাতে নিচ্ছে সরকার।

নদী ভাঙন রোধে করণীয়

নদী তীর ভাঙন থেকে রক্ষা করতে নতুন কৌশল উদ্ভাবন করেছেন প্রকৌশলী সৈয়দ এমদাদুল হক।

তার উদ্ভাবনী কৌশলটি হচ্ছে , পানির সর্বনিম্ন লেভেল থেকে উপরিভাগের ঢালে ছিদ্রযুক্ত কংক্রিটের ব্লকের গালিচা এবং প্লাস্টিকের প্রলেপযুক্ত মোটা তার দিয়ে গালিচা তৈরি। এই প্রযুক্তিকে পানি বিশেষজ্ঞরাও কার্যকর বলে মত দিয়েছেন।

জানা গেছে, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় প্রস্তাবিত পরস্পর সংযুক্ত কংক্রিট ব্লকের গালিচা প্রয়োগ করে একটা পাইলট প্রকল্প সম্পাদনে ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং এবং মানব হিতৈষী সংস্থাকে যৌথভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছে। বর্তমানে এ গবেষণাকে এগিয়ে নিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অনুমতির অপেক্ষায় রয়েছে। তারা সহযোগিতা করলেই গবেষণাটি সফলতার মুখ দেখবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে ইমদাদুল হক জানান, সরকারের বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং থেকে এ কাজ এগিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রযুক্তিবিদগণও এ ব্যাপারে সহযোগিতায় আগ্রহী বলে জানান ।

সর্বোপরি নদীভাঙনে দেশের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষগুলোর জন্য সরকারিভাবে সাহায্যের ব্যবস্থা নেয়া দরকার। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও উদ্যোগের মাধ্যমে নদীভাঙন প্রতিরোধ এখন সময়ের দাবি।