ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:

জিয়া উল হক

১৬ জুন ২০২১, ২১:০৬

কুরআনিক থট প্রসেস: আল কুরআনের চিন্তামানস - ৮ম পর্ব

18462_81621.jpg
গত পর্বে আমরা বলেছি যে মনোবিজ্ঞানীরা ‘চিন্তা’কে সর্বমোট ছয়টি ভাগে ভাগ করেছেন, ছয় ধরনের চিন্তার কথা বলেছেন। অতি সংক্ষেপে সেগুলো হলো যথাক্রমে;

(এক) পারসেপচুয়াল থিংকিং (Perceptual Thinking)। এটা হলো সবচেয়ে সহজ, সবচেয়ে প্রাথমিক স্তরের চিন্তাধারা বা থট প্রসেস (Thought Process)। মানুষ সাদা চোখে যা দেখে, যা শোনে বা যা বুঝে কিংবা যা উপলব্ধী করে তার উপরে ভিত্তি করে তার যে প্রাথমিক ধারনা তৈরি হয়, এটা হলো সেই স্তরের। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এইসব মতবাদ, ধারনা নিছক ধারনাই রেয় যায়, প্রায়োগিক ও ব্যবহারিক ক্ষেত্রে সে সবের তেমন কোন মুল্য নেই। খুব সাধারন বুদ্ধিমত্তার লোকজনই এমন চিন্তাস্তরকে ধারন করে থাকেন।

(দুই) দ্বিতীয় স্তরে রয়েছে (Conceptual or Abstract thinking) , যেখানে ব্যক্তিমানসে প্রাথমিক স্তরে যে সংকীর্ণ ও সীমাবদ্ধ চিন্তাধারা তৈরি হয়েছে তার বাইরে এসে তার সাথে আরও কিছ চিত্র, কিছু সম্ভাবনা নিজের মন ও মনন থেকে যোগ করে বিষয়টাকে ভেবে দেখে। এ স্তরে সে ভাষা, স্মৃতিতে রয়ে যাওয়া কোন বস্তু বা ঘটনাপ্রবাহের সাযুস্যকে ভিত্তি করে সম্ভাব্য একটা চিত্র কল্পনা করে নেয়, তার উপরে ভিত্তি করে সে চিন্তা করে এবং একটা স্বিদ্ধান্তে আসার চেষ্টা করে।

(তিন) তৃতিয় স্তরটি হলো পর্যালোচনামূলক বা রিফ্লেক্টিভ চিন্তা (Reflective thinking)। এই স্তরে ব্যক্তি তার মানপটে রক্ষিত অতিত স্মৃতি, অতিত অভিজ্ঞতাকে রোমাান্থন করে, অতিতে ঘটিত ঘটনা ও পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে, তার গতিপ্রবাহ, ঘটিত ফলাফল, সে সব ক্ষেত্রে তার নিজের বা পারিপাশ্বিক পরিবেশে কার কি ভূমিকা ছিল, সেই সব ভূমিকার কি ফলাফল হয়েছিল? সেগুলোকেও ভেবে দেখে এবং বর্তমান ও ভবিষ্যৎ ঘটনাপ্রবাহের ফলাফলকে সেই আলোকে কল্পনা করতে চেষ্টা করে, সেই আলোকে তার উপলব্ধী, ও করণীয়কে নিরুপণ করতে চায়।
এই স্তরের চিন্তাধারার সুত্র ধরে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যে স্বিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, সে ব্যাপরে সে বা তারা সঙ্গতকারণেই আত্মবিশ্বাসে বলিয়ান থাকে।

(চার) চতুর্থ স্তরটি হলো ক্রিয়েটিভ বা প্রত্যুৎপন্নমতিতাময় স্তর (Creative Thinking)) এখানে ব্যক্তি চিন্তার ক্ষেত্রে অনেকটা অগ্রগামী থাকেন। তিনি এমন কিছু চিন্তা করেন, যার কোন অতিত নজির, কোন অভিজ্ঞতাও তার সামনে নেই, পারিপার্শ্বিক পরিবেশ ও পরিস্থিতেও তেমন কোন উদাহারণ তার জানা নেই। এখানে ব্যক্তি অতিতের নানা মত ও পথকে বিশ্লেষণ করে নতুন পথ ও মত উদ্ভাবন করে। এটা খুবই উন্নত, শক্তিশালী ও সম্ভবনাময় একটা চিন্তাস্তর।

(পাঁচ) পঞ্চমটি হলো অনুসন্ধিৎসু ক্রিটিকাল চিন্তাস্তর (Critical Thinking)। এই চিন্তাস্তরে ব্যক্তিকে নিজ মনের সকল পূর্বধারনাকে ((Prejudice) একপাশে সরিয়ে রেখে স্বৎ ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে ভাবতে হয়। এটা খুবই উন্নত মানসসম্পন্ন লোক না হলে তার দ্বারা সম্ভবপর হয় না। গভীর গবেষণার জন্য এই চিন্তাস্তরটি অপরিহার্য।

প্রথিতযশা জ্ঞানী ও চিন্তাবীদ, আলেম-ওলামা, মুজতাহিদ-ফক্বিহরা সাধারণত এই চিন্তাস্তরকে ধারন ও লালন করেন। যিনি যতোটা যতœ ও পরিশ্রমের সাথে এই স্তরকে নিজের মধ্যে তৈরি করতে ও ধরে রাখতে পারবেন, বুদ্ধিজীবি গবেষক হিসেবে তিনি ততোটাই সফল। আল কুরআন থেকে শিক্ষা নেবার ক্ষেত্রে এই চিন্তামানস ছাড়া আর কোন পথ নেই। প্রত্যেক মুসলমানের উচিৎ তার নিজের মধ্যে চিন্তামানসের বা থট প্রসেসের এই স্তরটি (পঞ্চম স্তর) তৈরি করে নেওয়া।

এটা সত্য যে, এরকম একটা স্তর তৈরির জন্য প্রচুর ধৈর্য ও অধ্যাবসায় প্রয়োজন। এই জন্যই মুসলমানদের জন্য নিজের নফসের সাথে বুঝা পড়ার, চিন্তা গবেষণার গুরুত্ব ইসলামে সবচেয়ে বেশি। আল কুরআনে যেমন আল্লাহ পাক বার বার এ ব্যাপারে আমাদের উৎসাহ দিযেছেন, ঠিক তেমনই প্রিয় রাসুল সা: এঁর অসংখ হাদিসেও এ সংক্রান্ত অনেক তাগাদা এসেছে। আসহাবে রাসুল সা: দের প্রায় সকলেই এরকম চিন্তাস্তরে উন্নিত হয়েছিলেন, যদিও তাদের অধিকাংশজনই নুন্যতম লেখাপড়াও জানতেন না।

(ছয়) আর সর্বশেষ এ চিন্তাস্তরের কোন সুনির্দিষ্ঠ লক্ষ্য ও গতি নেই, বলা চলে, লক্ষ্যহীন, উদ্দেশ্যহীন (Non-directed or Associative Thinking)। যে কোন ব্যক্তির জন্য এই চিন্তাস্তরটি পথচ্যুতির অন্যতম একটা কারণ, যদিও তারা বুদ্ধিবুত্তিকভাবে বেশ কর্মতৎপর, ও চিন্তা করার মতো আগ্রহ উদ্দীপনা, মানসিক ইচ্ছাশক্তি সব থাকে, কিন্তু মন ও মানসে কোন সুনির্দিষ্ঠ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য না থাকায় তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পথ হাতড়ে মরেন।

এরকম স্তরের উদাহারন দিতে গেলে সবচেয়ে বড়ো উদাহারণ হলো একজন কবি। সব কবি না হলেও অধিকাশং কবিদের চিন্তাস্তর হলো এটি। কুরআনে পাকে আল্লাহ পাক নিজেই বলেছেন;

এবং কবিদের যারা অনুসরণ করে তারা বিভ্রান্ত। আপনি কি দেখেন না যে তারা প্রতি ময়দানেই উদভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়ায় এবং এমন কথা বলে যা তারা করে না। তবে তাদের কথা ভিন্ন যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে এবং অত্যাচারিত হলে প্রতিশোধ গ্রহণ করে। অত্যাচারীরা অচিরেই জানিবে কোন স্থানে তারা ফিরে আসবে। (সূরা-আশশুয়ারা: ২২৪-২২৭)

বাস্তব জীবনেও আমরা অহরহ সুনির্দিষ্ঠ গন্তব্য, উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যহীন চিন্তকের অস্তিত্ত দেখি। এমন অনেক গবেষক বুদ্ধিজীবির দেখা পাই যারা প্রচুর সময় ও শ্রম দিয়ে নানা বিষয়ে চিন্তা গবেষণা করেন, কিন্ত তাদের সেই চিন্তা ভাবনা তেমন কোন ফল বয়ে আনে না, বা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সকল সদ্চ্ছিা সত্তেও নিজেদের অজান্তেই তারা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। কখনও কখনও বড়ো রকমের ভুলও করে ফেলেন ।(সংক্ষেপকৃত)

ফেসবুক টাইমলাইন থেকে সংগৃহীত