ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:
ব্রেকিং নিউজ
  • মালয়েশিয়ায় সর্বাত্নক লকডাউনের ঘোষণা
  • সোহবত ছাড়া দাওয়াত ফলপ্রসূ হয় না
  • দশ মিনিটে ক্যান্সার পরীক্ষা, হার্ভার্ডে ডাক পেলেন আবু আলী
  • দ্বিতীয় শ্রেণিতে পাশ করেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক!
  • দেশে নতুন সেনাপ্রধান এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ

এনএনবিডি ডেস্ক

১০ জুন ২০২১, ১৭:০৬

সোহবত ছাড়া দাওয়াত ফলপ্রসূ হয় না

18279_দাওয়াত.jpg
ছবি- সংগৃহীত
মদ খাওয়া হারাম ঘোষণার পরও কয়েকজন সাহাবী মদ খাওয়া ছাড়তে পারেননি। তারা নিয়মিত মদ খেতেন, শাস্তিও পেতেন। এমনকি ইয়ারমুক-কাদিসিয়ার যুদ্ধে কোনো কোনো সাহাবী লুকিয়ে মদ খেয়েছেন, এই অভিযোগও পাওয়া যায়।

নবিজীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যুগে আব্দুল্লাহ নামের একজন সাহাবী মদ খেতেন। তাঁকে বেশ কয়েকবার শাস্তিও দেওয়া হয়েছিলো, তবুও তিনি ছাড়তে পারেননি। একবার শাস্তি দেওয়া শেষে একজন তাঁকে বললো, “হে আল্লাহ! তাঁর উপর লানত বর্ষণ করুন। আর কতোবার নেশাগ্রস্ত অবস্থায় তাঁকে এখানে আনা হবে?”

লানতের কথা শুনে নবিজী লানতকারীকে সাবধান করে দিয়ে বললেন, “তাঁকে লানত দিও না। আল্লাহর কসম! সে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলকে ভালোবাসে।” [সহীহ বুখারী: ৬৭৮০]

আরেকজন সাহাবী ছিলেন আবু মিহজান (রাদিয়াল্লাহু আনহু)। কাদিসিয়িয়ার যুদ্ধে সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাসের (রাদিয়াল্লাহু আনহু) নেতৃত্বে মুসলিমরা যুদ্ধ করছে। আবু মিহজান (রা:) যুদ্ধের ময়দানে লুকিয়ে মদ খেতে গিয়ে ধরা খান, তাঁকে বেঁধে রাখা হয়। তিনি বলেন, “আমার দুঃখের জন্য এটাই যথেষ্ট যে, অশ্বারোহী মু. জাহিদরা বর্শার মুখোমুখি হবে আর আমি শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকবো।” [আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ৯/৬৩২-৬৩৩]

ওয়াহশী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) সহ আরো দু-চারটা ‘ব্যাতিক্রমী’ ঘটনা পাওয়া যায়। সাহাবীদের যে সংখ্যা এবং বৈশিষ্ট্য, সেটার তুলনায় এরকম দু-চারটি ঘটনা শতকরা হিশাবে .০০১% হবে না।

আল্লাহর বিধানের বেলায় ৯৯.৯৯% সাহাবীদের বৈশিষ্ট্য ছিলো- সামি’গনা ওয়া আতাগ’না (শুনলাম এবং মেনে নিলাম)। মদ নিষিদ্ধের আয়াত নাযিল হবার আগেই অনেক সাহাবী মদপান ছেড়ে দেন, মদ নিষিদ্ধ হবার পর অনেক সাহাবী মুখে আঙ্গুল ঢুকিয়ে বমি করেন। যেদিন মদ নিষিদ্ধ হয়, মদীনায় সেদিন নিজেদের মদের ড্রামগুলো ভেঙ্গে ফেলেন অনেক সাহাবী।

তাহলে উপরের ‘Exceptional’ ঘটনাগুলো আমি কেনো নিয়ে আসলাম? এই প্রশ্নের উত্তর আমি এখন দেবো, ইন শা আল্লাহ।

উম্মতের সব জেনারেশনের সাথে সাহাবীদের ঈমান আমলের তুলনা করলে সেটাকে বলা যায় পিরামিডের ঐ উপরের অংশের সাথে। সেখানে পৌঁছা উম্মতের আর কোনো জেনারেশনের পক্ষে সম্ভব না। এর স্বপক্ষে নবিজীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাদীসও আছে।

আমরা স্লোগান দেই- বাংলাদেশের নব্বই ভাগ মুসলমান। আচ্ছা, বাংলাদেশের নব্বইভাগ মুসলমান উপরে যে দুইটা পার্সেন্টিজ দেখালাম, সেটার কোনটাতে অন্তর্ভূক্ত? তারা কি ইসলামের কোনো বিধানের বেলায় ‘শুনলাম এবং মেনে নিলাম’ নীতি ফলো করে, নাকি তারা জুম’আর নামাজও পড়ে আবার দলভেদে বলাকা, স্ট্রার সিনেপ্লেক্সে মুভি দেখতে যায়?

আমাদের গড় মুসলিমদের বৈশিষ্ট্য হলো- সে মুভি দেখবে, প্রেম করবে, ঘুষ দিবে-খাবে, যুবকরা পর্ন দেখবে, মাস্টারভেশন করবে, রুমডেট-হোটেলডেট করবে আবার শুক্রবারে জুম’আর নামাজে যাবে, ঈদের নামাজে যাবে, শবে বরাত, শবে কদরে মসজিদে ভিড় জমাবে। চোখকান খুলে একটু নজর দিলেই এমন বৈশিষ্ট্যের ‘মুসলমান’ আপনি দেখতে পাবেন। যদি তাও না পান, একটা ভার্সিটিতে একদিন-একরাত ঘুরে আসুন, রমনা-সোহরাওয়ার্দীতে চোখ মেলে একদিন গিয়ে দেখবেন।

আবার সেই যুবক-যুবতীরা সত্যিকার অর্থেই এতোটা আবেগী যে, কেউ আল্লাহ-রাসূল নিয়ে কিছু বললে জান দিয়ে দেবে। রাসূলকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অপমান করা হয়েছে, এটা তাকে বুঝাতে পারলে সে অপবাদকারীর শিরচ্ছেদ করতে দু-মিনিট চিন্তাও করবে না।

তারমানে তারা সত্যিকারার্থে আল্লাহ-রাসূলকে ভালোবাসতে চায়, কিন্তু ভালোবাসার উপাদান খুঁজে পাচ্ছে না। সেই ভালোবাসা তারা ভিন্নখাতে প্রয়োগ করছে। যুবসমাজকে ফিরিয়ে আনতে হলে প্রেকটিক্যাল স্টেপ নিয়ে আগাতে হবে। এটা ধারণা করা যাবে না যে, তাদেরকে একটা ফেসবুক পোস্ট পড়ালে, একটা ভিডিও দেখালে, একটা বই পড়ালে রাতারাতি তারা আবু বকর-উমরের (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) মতো হয়ে যাবে।

যে মাদকাসক্ত, তার কাছে কিভাবে পৌঁছাবেন?
যে প্রেমে লিপ্ত, তার কাছে কিভাবে যাবেন?
যে পর্নোগ্রাফি, মাস্টারভেশনে আসক্ত, তাকে কিভাবে দাওয়াত দিবেন?
যে মুভি-সিরিজ দেখে দিনরাত কাটায়, তার কাছে কিভাবে যাবেন?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা জরুরি। হাজারটা ফতোয়া তাদেরকে এই পাপাচার থেকে ফিরাতে পারবে না। মানুষ তার ফতোয়া শুনে, যাকে সে ফলো করে, যার থেকে সে উপকৃত হতে পারে বলে আশা করে।

দাওয়াতের কাজ এক, ফতোয়াবাজির কাজ আরেক। নবিজী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মিম্বার থেকে শুধু “অবিবাহিতদেরকে বিয়ে দাও” বলেই ক্ষান্ত হোননি। জুলাইবিবের (রাদিয়াল্লাহু আনহু) মতো সাহাবী, যার সাথে কেউ মেয়ে বিয়ে দিতো না, সেই তাঁর জন্য নবিজী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিয়ের পয়গাম পাঠিয়েছেন।

আমাদের সমাজে এখনো মানুষ হুজুরদেরকে কদর করে, তাঁদের কথা শুনে। তাঁরা মসজিদের মিম্বার থেকে ‘যুবকদেরকে বিয়ে দাও’ বলছেন ঠিক, কিন্তু যুবকদের গার্জিয়ানদের কাছে গিয়ে হাত ধরে বলছেন না, “ভাইজান, সময়টা ভালো না। ছেলেমেয়েদেরকে বিয়ে দিয়ে দিন, তারা তো কাজ করবে, আর রিজিকের মালিক তো আল্লাহ।” এই একটা কথা ম্যাজিকের মতো কাজ করতো।

যুব সমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে যতোক্ষণ না প্রেকটিক্যাল পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, ততোক্ষণ পর্যন্ত তাদেরকে ফিরানো যাবে না। তাদের সাথে মেলামেশা করে সম্পর্ক তৈরি করা না হলে, তারা কেনো আগ বাড়িয়ে হালাল-হারামের ফতোয়া জানতে চাইবে?

দাওয়াত দেবার জন্য ফতোয়ার নলেজ যতোটা না থাকতে হবে, তারচেয়ে বেশি থাকতে হবে প্রজ্ঞা। তরুণ-যুবকরা সারাদিন মুখিয়ে থাকে, কখন বিকেল হবে আর কখন মাঠে খেলতে যাবে। সেই খেলার মাঠে গিয়ে যখন দাওয়াত দেওয়া শুরু করবেন, তখন তাদের কাছে প্রচণ্ড বিরক্ত লাগবে। দু-চারজনকে হয়তো মসজিদে নেওয়া যাবে, কিন্তু বাকিদের এমন ঘৃণাভাব জন্মাবে, হুজুরকে দেখলেই পালাতে চাইবে।

নবিজী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রেসলার রুকানাকে দাওয়াত দিতে গিয়ে তার সাথে কুস্তি করেন, নবিজীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাথে কুস্তিতে পরাজিত হয়ে সে ইসলাম গ্রহণ করে। যুবকদেরকে দাওয়াত দিতে গিয়ে ফুটবলে দুই-একটা শট মারলে সেটা বরং তাদের কাছে দাওয়াত গ্রহণের আগ্রহ বাড়াবে।

তাই বলে, যারা মদ খায় তাদের জন্য কয়েক বোতল মদ নিয়ে যাবেন? যারা প্রেম করতে চায় তাদেরকে গার্লফ্রেন্ড-বয়ফ্রেন্ড জুটিয়ে দিয়ে ‘দাওয়াত’ দিবেন? না, মোটেই না। শরীয়তের বাউন্ডারির মধ্যে থেকে দাওয়াত দেবার যতোগুলো পদ্ধতি ফলো করা যায়, সবগুলো ফলো করা হলো প্রজ্ঞার পরিচয়।

ডেটিং করা শেষে যে ছেলেটা মসজিদে ঢুকছে, তাকে দেখে টিটকারি, হাসিতামাশা করাটা কোনোভাবেই একজন দা’ঈর কাজ না। যে যুবক প্রেম করে মসজিদে ঢুকছে, তাকে দেখে তো একজন দা’ঈ ভাববেন, এই তো আমার সুযোগ। তাকে প্রেমের বিরতিতে দাওয়াত দেবার সুযোগ হয়নি, সে নিজেই মসজিদে হাজির। এখন তো তার সাথে সম্পর্ক তৈরি করে মসজিদমুখী করে হারাম থেকে তাকে ফিরানো যাবে।

কিন্তু প্রথম দেখায় যদি বলি- এই, তুমি প্রেম ছেড়ে দাও! সে তো প্রেম ছাড়বেই না, উল্টো আমাকে দেখলে বিপরীত রাস্তায় পালাবে।

সোহবত ছাড়া দাওয়াত ফলপ্রসূ হয় না। আর প্রজ্ঞাহীন দা’ঈ হারামে লিপ্ত থাকা পাপীর জন্য বরং বিপজ্জনক।

আরিফুল ইসলাম
শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়