ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:
ব্রেকিং নিউজ
  • মালয়েশিয়ায় সর্বাত্নক লকডাউনের ঘোষণা
  • সোহবত ছাড়া দাওয়াত ফলপ্রসূ হয় না
  • দশ মিনিটে ক্যান্সার পরীক্ষা, হার্ভার্ডে ডাক পেলেন আবু আলী
  • দ্বিতীয় শ্রেণিতে পাশ করেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক!
  • দেশে নতুন সেনাপ্রধান এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ

সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা

৯ জুন ২০২১, ০৯:০৬

বাজেট প্রস্তাবনা ও বাস্তবতা

18201_BBB.jpg
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু এই বাজেটকে অর্থনীতিবিদরা সময়োচিত ও বাস্তবসম্মত মনে করছেন না। ঘোষিত বাজেটে করোনা সৃষ্ট চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কোন সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। যা নতুন বাজেটের বড় দুর্বলতা। ৬ লাখ ৩ হাজার ৬শ ৮১ কোটি টাকার এই উচ্চাভিলাষী বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ২ শতাংশ। সার্বিক অর্থনীতিতে মহামারীর প্রভাবে এই লক্ষ্য কমিয়ে ধরা হয়েছে, তা বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন। কিন্তু তারপরও এই লক্ষ্যে পৌঁছার বিষয়টি সংশয়মুক্ত থাকছে না বরং অবাস্তবই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মূলত, করোনা সৃষ্ট বিপর্যয়ের মধ্যেও ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে বিশাল জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ জন্য কিছু পণ্য ও সেবার ওপর কর বাড়ানো হয়েছে, আবার ছাড়ও দেওয়া হয়েছে। তবে বাজেট করতে গিয়ে পাঁচ বিষয়কে বিবেচনায় নেয়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন অর্থমন্ত্রী। বাজেট বক্তৃতায় তিনি বলেছেন, আমদানি পর্যায়ের শুল্ক, রেগুলেটরি ডিউটি, সম্পূরক শুল্ক ও মূল্য সংযোজন করসংক্রান্ত প্রস্তাবসমূহ প্রদানের ক্ষেত্রে নিম্নের বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক মহামারিতে ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।
এগুলো হলো, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয়, রপ্তানিমুখী শিল্প বহুমুখীকরণ এবং তার সংযোগ শিল্পে প্রণোদনা। স্বাস্থ্য, কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, অটোমোবাইল, ইলেকট্রনিকস এবং আইসিটি খাতের বিকাশ ও উন্নয়ন। ব্যবসায় সহজীকরণ সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানের উন্নয়ন এবং স্থানীয় শিল্পের বিকাশ ও প্রতিরক্ষণে শুল্কহার যৌক্তিককরণের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব (মূল্য সংযোজন কর ও আয়কর) আহরণ বৃদ্ধি। কিন্তু প্রস্তাবগুলো বেশ আকর্ষণীয় ও শ্রæতিমধুর মনে হলেও তা বাস্তববায়ন মোটেই সহজসাধ্য হবে না। ফলে জিডিপির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অনেকটা অধরায় থেকে যাবে।
মূলত, আমাদের দেশে নতুন বছরের বাজেট ঘোষণার পর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় জিডিপির প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা। এবারও বিষয়টি বিভিন্ন মহলেই আলোচনায় এসেছে। এমনকি রাজনীতির অঙ্গনেও বিষয়টি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। প্রতিবার বাজেটে সরকার জিডিপি প্রবৃদ্ধির অবাস্তব ও উচ্চাভিলাসী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে। কিন্তু প্রায় ক্ষেত্রেই তা অর্জন করা সম্ভব হয় না। এবারের বাজেটে জিডিপির লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ধরার দাবি করা হলেও তা বাস্তবসম্মত মনে করছেন না অর্থনীতিবিদরা। ফলে বিষয়টি নিয়ে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
মূলত, অর্থনীতিতে জিডিপির প্রবৃদ্ধি বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি আমাদের দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনায় স্থান করে নিয়েছে। বিষয়টিকে মহলবিশেষ ইতিবাচক হিসাবেই দেখতে চাচ্ছেন। বিশেষ করে সরকার সংশ্লিষ্টরা। যদিও সমকালীন অর্থনীতিকদের সিংহভাগই প্রবৃদ্ধির এই অঙ্ককে অর্থনীতির গতিশীলতা হিসেবে মানলেও টেকসই উন্নয়নের সূচক হিসেবে মানতে পারছেন না। মূলত, সমস্যাটা সেখানেই। ঘোষিত বাজেট প্রস্তাবনায় দাবি করা হয়েছে, ‘মহামারী শুরুর পর ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৮ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হলেও, তা উচ্চাভিলাষী বলেই মত দিয়েছিলেন অনেকে। প্রবৃদ্ধি অর্জন লক্ষ্যের কাছাকাছি না গেলেও মহামারীর মধ্যেও যেটুকু অর্জিত হয়েছে, সেটাও কম নয়’। অর্জিত প্রবৃদ্ধি নিয়ে অর্থমন্ত্রী সন্তোষপ্রকাশ করলে তার সাথে একমত হতে পারছেন না অনেকেই। তবে তার দাবির মধ্যে প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ার আত্মস্বীকৃতি মিলেছে।
অর্থমন্ত্রী দাবি করেছেন, কোভিড-১৯ মহামারীর প্রকোপ অব্যাহত থাকা সত্তে¡ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সুদক্ষ ও বিচক্ষণ নেতৃত্বের কারণে সামষ্টিক অর্থনীতির ব্যবস্থাপনার দক্ষতা ও উৎকর্ষ সাধন এবং প্রাজ্ঞ রাজস্ব নীতি ও সহায়ক মুদ্রানীতি অনুসরণের মাধ্যমে সরকার সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। বিগত এক দশকে বাংলাদেশের উচ্চ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন কোভিড মহামারীর প্রভাবে সাময়িক বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে রেকর্ড ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন হলেও করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে তা হ্রাস পেয়ে ৫ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। গত অর্থবছরে বাংলাদেশ ৫ দশমিক ২ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। যা ছিল এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ। তার ভাষায়, কোভিড পরবর্তী উত্তরণের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আগামী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার ৭ দশমিক ২ শতাংশে নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনে নি¤œমুখীতার জন্য অর্থমন্ত্রী করোনা ভাইরাসকে দায়ি করলেও বিষয়টিকে আংশিক সত্য বলে মনে করেছেন অর্থনীতিবিদরা। কারণ, প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণই ছিল বাস্তবতাবিবর্জিত। তাই করোনার দোহাই দিয়ে বাস্তবতাকে অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই।
অবশ্য কী কারণে জিডিপি প্রবৃদ্ধি চলতি অর্থ বছর কম হয়েছে এবং আগামী অর্থবছরে কমিয়ে ধরতে হয়েছে, তার একটা ব্যাখ্যাও দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। কিন্তু এই ব্যাখ্যাকে কেউই বাস্তবসম্মত মনে করছেন না বরং ‘শাক দিয়ে মাছ ঢাকা’র কসরত বলেই মনে করা হচ্ছে। তিনি বলেছেন, মহামারীর প্রভাব দীর্ঘতর হওয়া, বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ এবং পুনরায় লকডাউন ঘোষণার কারণে অর্থনীতির গতি শ্লথ হয়ে পড়েছে। রপ্তানি ও আমদানির ক্ষেত্রেও কাঙিক্ষত গতি নেই। তবে প্রবাসী আয়ে গতিশীলতা এবং অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নকে হিসাবে ধরে বিদায়ী অর্থবছর জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কমলেও ৬ দশমিক ১ শতাংশ হবে বলে জানিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, আইএমএফ  ও বিশ্ব ব্যাংক উভয়ই বাংলাদেশের জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়িয়েছে। তার এই দাবি নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
অর্থমন্ত্রী বলেছেন, বিশ্ব ব্যাংক পূর্বাভাস দিয়েছে, আগামী বছর বাংলাদেশ ৫ দশমিক ১ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি পেতে পারে। আর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল-আইএমএফ দাবি করেছে, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি আগামী বছর হতে পারে সাড়ে ৭ শতাংশ। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ৭ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির প্রক্ষেপন দিয়েছে, যা সরকারেরও লক্ষ্য। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব আন্তর্জাতিক সংস্থা বাংলাদেশের জিডিপির লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে যে উচ্চাশা করেছে তা সরকারের অতিমাত্রার ঢাকা-ঢোল পেটানোরই ফল। অর্থনীতিবিদরা এই দাবির কোন সারবত্তা খুঁজে পাচ্ছেন না। তাই অর্থমন্ত্রীর দাবি ও আশাবাদ যে বাস্তবতার মুখ দেখবে না তা মোটামোটি নিশ্চিত করেই বলা যায়। ফলে জিডিপি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন আগামী দিনেও অতীত বৃত্তেই আটকা পড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।
মূলত, এবারের বাজেটের সকল কিছুই আবর্তিত হয়েছে পুরনো বৃত্তেই। প্রস্তবিত বাজেটে প্রবৃদ্ধির হার ৭ দশমিক ২ শতাংশ ধরা হলেও ঘাটতি দেখানো হয়েছে জিডিপির ৬.২ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি ধরা হয়েছে ৫.৩ শতাংশ। প্রস্তাবিত বাজেট এবং প্রবৃদ্ধির হার বাস্তবতা বিবর্জিত ও কল্পনা নির্ভর বলে মনে করছেন অর্থনীতি সংশ্লিষ্টরা। বাজেটে আয় ও ব্যয়ের মধ্যে বিশাল ব্যবধান স্পষ্টতই দৃশ্যমান। আর চলতি বাজেটের অধিকাংশই সরকার বাস্তবায়ন  করতে পারেনি। তাই প্রস্তাবিত বাজেটে কথামালার ফুলঝুড়ি থাকলেও সাধারণ মানুষ তাতে মোটেই আশ^স্ত হতে পারছেন না বরং প্রস্তাবিত এই বাজেটকে বাস্তবতাবিবর্জিতই মনে করছেন।
এবারের বাজেটে মোট এডিপি ধরা হয়েছে ২ লক্ষ ২৫ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা, রাজস্ব খাতে আয় ধরা হয়েছে ৩ লক্ষ ৮৯ হাজার কোটি টাকা। গত অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহের। এটি অর্জন সম্ভব নয় জেনে পরে লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ৩ লাখ ১ হাজার কোটি টাকা করা হয়। কিন্তু গত ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) রাজস্ব সংগ্রহ হয়েছে মাত্র ১ লাখ ৯৭ হাজার ৫৮৩ কোটি টাকা। সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা থেকেও সংগ্রহ ১ লাখ ৩ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা কম, যা আদায় করার কথা মে ও জুন এ দুই মাসে। যা কখনোই সম্ভব নয়। তাই ঘোষিত বাজেট অতীত ও চলমান বৃত্তে আটকা পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে দেশের মানুষকে অনেক আশার বাণী শোনালেও সার্বিক দিক বিবেচনায় অন্তঃসারশূণ্য বলেই মনে হচ্ছে।  ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ২০ শতাংশ ধরা বাস্তসম্মত হয়নি বলে অভিমত দিয়েছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)। একই সাথে করোনাভাইরাস মোকাবিলা এবং মহামারি থেকে ফিরে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করার জন্য যে বাজেট প্রয়োজন ছিল, তাও প্রস্তাবিত বাজেটে নেই বলে মনে করছে এ গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি। যা খুব বাস্তবসম্মত অভিমত।
গত ৩ জুন অর্থমন্ত্রী জাতীয় সংসদে ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপনের পর ভার্চুয়ালি আয়োজিত সিপিডির তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় এসব অভিমত তুলে ধরে প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধিরা। তারা বলছেন, জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ২০ শতাংশের কথা বলা হয়েছে। এখানে বলা হচ্ছে-২০২০-২১ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি দেখানো হয়েছে ৬ দশমিক ১০ শতাংশ। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে অর্থনীতির অন্যান্য যেসব সূচক পরিলক্ষিত হচ্ছে, সেই সূচকের প্রেক্ষিতে এটা একটু বেশি। আর তা বাস্তবায়নের সম্ভাবনা খুবই কম।
বাজেট প্রতিক্রিয়ায় বলা হয়, প্রস্তাবিত বাজেটের সার্বিক দিক বিবেচনায়  সামষ্টিক কাঠামো তথা রাজস্ব আয়, ব্যয় এবং বিনিয়োগ ইত্যাদির যে কাঠামো দেয়া হয়েছে, তা মোটেই বাস্তবসম্মত হয়নি। রাজস্ব কাঠামোতে বড় ধরনের কোন পরিবর্তন নেই। প্রস্তাবিত বাজেটের লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছতে হলে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৩০ শতাংশ বাড়ানো দরকার। কিন্তু তাও বাস্তবসম্মত নয়। প্রতিক্রিয়ায় আরও বলা হয়, করোনা মোকাবিলা এবং করোনা থেকে ফিরে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করার জন্য যে বাজেট প্রয়োজন ছিল, প্রস্তাবিত বাজেটে তার প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়নি। সামগ্রিক বিবেচনায় মনে হয়-করোনাকালীন এ বাজেট দুর্বল ও গতিহীন। বিধায় তা বাস্তবায়নের সীমাবদ্ধতা আমাদেরকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে।
ঘোষিত বাজেটে আয়করের সীমা ওপরের দিকে বাড়ানো হয়নি। একইভাবে নিচের দিকের সীমা অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। এর ফলে কর ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। নিচের দিকে আয়করের সীমা আর একটু বাড়ালে ভোগ ব্যয় বাড়তো। তা বিনিয়োগে সহায়তাও করতে পারতো। অর্থাৎ পুনরুদ্ধারে সহায়তা করতে পারতো। সরকারি ব্যয়ের বর্ধিত বরাদ্দে দেখা যাচ্ছে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জনপ্রশাসনে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। পাবলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও একটা বর্ধিত বরাদ্দ দেখা যাচ্ছে। খাতওয়ারি বিষয়ের মধ্যে সবার আগে আসে স্বাস্থ্যখাত। স্বাস্থ্যখাতের মূল বিষয় এখন টিকাদান। করোনা কতদিন থাকবে কেউ জানে না। তাই বিষয়টি নিয়ে সময়োচিত ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা দরকার। কিন্তু বিষয়টি ঘোষিত বাজেটে উপেক্ষিত থেকেছে।
মূলত করোনা থেকে মুক্তি না পেলে অর্থনীতিতে চাঞ্চল্য ফিরে আসবে না। সেজন্য সকলকেই টিকাদান কর্মসূচি আওতায় এনে সবার জন্য টিকা নিশ্চিত করা দরকার। কিন্তু ঘোষিত বাজেটে তার কোন নিশ্চয়তা রাখা হয়নি। কারণ, টিকাদানের জন্য বাজেটে ১০ হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছে, কিন্তু তা মোটেই পর্যাপ্ত নয়। বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠীর জন্য এই বরাদ্দে সবার জন্য টিকা নিশ্চিত করা যাবে না। বাজেটে স্বাস্থ্যখাতের বরাদ্দ গত বছরের মতোই রাখা হয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে স্বাস্থ্যখাতের বরাদ্দ জিডিপির দশমিক ৮৩ শতাংশ ছিল। এ বছরেও দশমিক ৮৩ শতাংশ রয়েছে। কিন্তু এ বরাদ্দ আমাদের দেশের বিপর্যস্ত স্বাস্থ্যখাতের জন্য মোটেই যথাযথ হয়নি বরং প্রয়োজন বিবেচনায় পূণর্মূল্যায়ন করা জরুরি ছিল।
ঘোষিত বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তাখাতে সামান্য কিছু ভাতা ও বরাদ্দ বেড়েছে। কিন্তু সেখানে আগের মতোই সরকারি কর্মচারীদের পেনশন রয়েছে। এখানে পেনশন যতোটা বেড়েছে, সামাজিক নিরাপত্তার আসল যে অংশ সেখানে নিট ততোটা বাড়েনি। সুতরাং এখানে বরাদ্দ আরও বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা থাকলেও তা বরাবরের মতোই উপেক্ষিত হয়েছে। ফলে ঘোষিত বাজেটকে সার্বিকভাবে গণমুখী বলার কোন সুযোগ নেই।
ঘোষিত বাজেটে কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। নতুন বাজেটে অর্থায়নের ক্ষেত্রে কয়েকটি কাঠামোগত পরিবর্তন দেখানো হয়েছে। বিদেশি ঋণের কথা বলা হয়েছে। এটা বেশ ইতিবাচক। রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে যেসব নীতিমালা করা হয়েছে, সেখানে ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে নয় প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করে করা হয়েছে। এটাও ভাল উদ্যোগ। একইসঙ্গে এসএমইকে স্বল্পসুদে ঋণ দেয়া হবে। এটাও সমর্থনযোগ্য। কিন্তু বিশাল এই বাজেটে এতটুকু ইতিবাচক দিক বিবেচনায় প্রস্তাবিত বাজেটকে গণমুখী ও বাস্তবসম্মত বলার কোন সুযোগ নেই বরং বাস্তবতাবিবর্জিত, উচ্চাভিলাষী ও কল্পনাবিলাসী বলায় অধিক যুক্তিযুক্ত মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।