ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:
ব্রেকিং নিউজ
  • মালয়েশিয়ায় সর্বাত্নক লকডাউনের ঘোষণা
  • সোহবত ছাড়া দাওয়াত ফলপ্রসূ হয় না
  • দশ মিনিটে ক্যান্সার পরীক্ষা, হার্ভার্ডে ডাক পেলেন আবু আলী
  • দ্বিতীয় শ্রেণিতে পাশ করেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক!
  • দেশে নতুন সেনাপ্রধান এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ

মোঃ আবুল কালাম আজাদ

৭ জুন ২০২১, ২২:০৬

কাছ থেকে দেখা

একজন সফল মানুষের নাম: শাহ আব্দুল হান্নান

18153_shah abdul hannan.jpg
শাহ আব্দুল হান্নান একটি নাম, একটি বিস্ময়কর ইতিহাস ও ধ্রবতারার নাম। এদেশের প্রশাসনের কাছে ও ধর্মপ্রাণ মানুষের হৃদয়ে শাহ আব্দুল হান্নান এক মাইলফলক ও মাইলস্টোন এবং ব্যতিক্রমধর্মী ব্যক্তিত্ব। এমন সৎ নিষ্ঠাবান নৈতিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত সত্য ন্যায়ের ধ্বজাধারী প্রশাসক এশিয়া মহাদেশে বিরল। সর্বজ্ঞানে গুনান্বিত একজন বাতিঘর ও আলোক মশাল। অমায়িক ব্যবহার , মিষ্টভাষী অতুলনীয় বাণীপ্রবর কালজয়ী প্রতিভার অধিকারী , আদর্শ শিক্ষক সব্যসাচী লেখক , দক্ষ প্রশাসক  সফল সংগঠক , গর্বিত পিতা , সমাজসেবক , গবেষক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ক্ষুরধার আলোচক অগ্নিস্রাবী বক্তা, আজীবন তরুণ কালের খেয়ার একজন আদর্শ নাবিক শাহ আঃ হান্নান। যাকে চাচা বলেই সম্বোধন করতাম সর্বদা। তিনি বাংলাদেশ ইসলামী অর্থনীতি ও সাহিত্য সংস্কৃতির ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে ভাস্বর হয়ে থাকবে। এক অনুপম ও দুর্লভ  প্রতিভার অধিকারী স্বকীয় সৃজনশীল কল্যাণকামী মৌলিক সৃষ্টি ও বক্তব্যে তিনি দক্ষ সুনিপুণ ও কালোত্তীর্ন মহান শিক্ষক। একাধারে কোরআন , হাদীস , ফিকাহ , বাংলা ইংরেজি , ইতিহাস দর্শনে অর্থনীতিসহ সাহিত্য-সংস্কৃতির সকল বিষয়ে তিনি ছিলেন খুরধার আদর্শ পন্ডিত।
 
শাহ আব্দুল হান্নান শুধু একজন ব্যক্তিই নন, তিনি আমাদের মাঝে একটি বিশাল বটবৃক্ষ। তিনি ছায়াপ্রার্থী অসংখ্য মানুষের ওপর ছাদ সুকোমল ছায়া বিস্তারকারী অনন্য ব্যক্তিত্ব। দেশ-জাতি জনতা এদেশের ধর্মীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ মানুষ নানা ভাবে তার দ্বারা উপকৃত হয়েছেন। এবং জীবনের নতুন পথের সন্ধান আদর্শিক পরিমন্ডলে বিশেষ করে মেধাবী তরুণদের তিনি অনুপ্রেরণাদায়ী হিসেবে আজীবন স্মরনীয় ও করনীয় হয়ে থাকবেন। হান্নান চাচা একজন সত্যিকার মুমিন। তার চিন্তা-কর্মে, আচার-আচরনে সকল সংকীর্নতার ঊর্ধ্বে উঠে দুনিয়ার সব মানুষের তার আলিঙ্গনে আবদ্ধ করতে পেরেছেন বলেই তিনি সকলের প্রিয় আর শ্রদ্ধেয় শাহ আব্দুল হান্নান। সেক্ষেত্রে অনন্য- বিরল এক গুনি পন্ডিত মানুষের নাম। বস্তুতঃপক্ষে তিনি একজন শিক্ষাবিদই নন, তিনি আমাদের এ অঙ্গনের সাহিত্য-সংস্কৃতির বাহক, অর্থনীতির দিকপাল, দর্শন ও শাস্ত্রের পন্ডিত, রাষ্ট্রনীতির নকিব পুরোধা এবং ইলমে দ্বীনের মহাসমুদ্র যা ঐতিহ্যিক পথ পরিক্রমার একজন নিয়মাবর্তি শ্রমনিষ্ঠ অন্যতম প্রধান অভিভাবক। তার শ্রম, সাধনা, মানবিকতা, তার প্রজ্ঞা এবং প্রতিজ্ঞা সে কেবল আমাদের প্রশাসন, অর্থনীতি ও সাহিত্য-সংস্কৃতির চারন ভ’মিকে কেন্দ্র করেই পরিব্যক্ত। পেশাগত জীবনের নানাবিধ আধারে ও তিনি এক্ষেত্রে টিকেই আছেন আধেয় হিসেবে মান্য করেছেন এবং জীবনের বাঁক অতিক্রম করে কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ন হয়েছেন। প্রমানিত হয়েছে তার পরীক্ষায় সততা-দক্ষতা, যোগ্যতা ও নৈতিকতার ঐশি শক্তি। প্রশাসনের কাছে এভাবে আরো প্রিয় থেকে শ্রদ্ধা ও আস্থার প্রতীক হিসেবে সকল কৃতি মানুষের মূল পরিচয় প্রতিভাত হয়েছে।
 
স্বপনচারি এ মহামনিষী প্রতিনিয়ত মেধাবীদের স্বপ্ন দেখানোর পাশাপাশি লালন ও করতেন। যার ফলে সারা বিশ্বের অসংখ্য শিক্ষাবিদ গবেষক দিকপাল তৈরি করে গত ২ জুন ২০২১, বুধবার মহান প্রভুর ডাকে সাড়া দিয়ে এ জগৎ ত্যাগ করেছেন। মহান রাব্বুল আলামিন তার জান্নাতের সুউচ্চ মাকাম দান করুন। আমিন।
 
হান্নান চাচা ছাত্র জীবন থেকে মূল ধারার আদর্শে অত্যন্ত নিষ্ঠাবান একজন কর্মী ছিলেন। স্কুলের আঙ্গিনায় থাকাকালেই তিনি দ্বীনের একজন বলিষ্ঠ কন্ঠস্বর ও দায়ী হিসেবেই চিহ্নিত হন। উচ্চ মাধ্যমিক পেরিয়ে দেশের সেবায় আত্মনিয়োগের বাসনা নিয়ে মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু সেখানে তার নিজের চিন্তা ও সিদ্ধান্ত কাজে লাগাতে পারেননি। মহান প্রভুর সন্তুষ্টির জন্য দায়িত্বশীলের পরামর্শ ক্রমে ভর্তি হন তৎকালীন পুরান ঢাকার জগন্নাথ কলেজে। উদ্দেশ্য একটাই সেখানে সংগঠন কায়েম করতে হবে। ডিগ্রিতে ভর্তির পর নতুন চিন্তা চেতনা নিয়ে কাজ শুরুর পাশাপাশি লেখাপড়াও অব্যাহত থাকে। ডিগ্রীতে ফাইনাল পরীক্ষায় অংশ নেন তিনি। প্রকাশিত ফলাফল হল সারা দেশে চাচা ২য় স্থান অধিকার করেন। এভাবে তার জীবনের ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল হতে থাকে। সফল মানুষের পথচলা এখান থেকে নতুন করে শুরু হয়। এর পরের বছরই প্রাদেশিক সেক্রেটারি জেনারেল মনোনিত হন। এরপর মাষ্টার্সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে ১ম স্থান অধিকার করেন। অতঃপর ১৯৬৩ সালে পাকিস্তান পাবলিক সার্ভিসে যোগ দান করেন। প্রশাসনের এ গুরুত্বপূর্ন বিভাগে বিভিন্ন বড় বড় দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এবং ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশের একজন ব্যতিক্রমধর্মী ক্যাডার সচিব থাকা অবস্থায় অবসর জীবনে চলে যান তিনি। মুমিনের কখনো অবসর হয় না। শাহ আবদুল হান্নান চাচা তার দীর্ঘ বর্নিল জীবনে দেশ, জাতি, মানবতার জন্য বিলিয়ে দিয়েছেন অবলিলায়। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত অর্থাৎ অসুস্থ হবার আগেও ভীষন ব্যস্ত ও রুটিন মাফিক জীবন পরিচালনা করতেন। 
 
শাহ আবদুল হান্নান ছিলেন প্রথিতযশা একজন বিদগ্ধ পন্ডিত, আন্তর্জাতিক মানের ইসলামি চিন্তাবিদ, শিক্ষাবিদ, লেখক, অর্থনীতিবিদ ও সমাজের সকল শ্রেনীর মানুষের একান্ত বন্ধু। তিনি তার বর্নাঢ্য কর্ম জীবনে অর্থমন্ত্রনালয়ের অভ্যন্তরিন সম্পদ বিভাগের সচিব ছিলেন। এর আগে কালেক্টরেট বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর, দুর্নীতি দমন ব্যুরোর মহা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি একসময় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন। তখন তিনি জাতীয় রাজস্ব বৃদ্ধির পরিকল্পনায় প্রথম ভ্যাট পদ্ধতি চালু মাধ্যমে বিরাট খ্যাতি অর্জন করেন। এরপর তিনি দারুল এহসান, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোক্তা ছিলেন। চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঢাকা ক্যাম্পাসের প্রধান দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন এবং ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের সাবেক চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি রাবেতা, ইবনে সিনা ইসলামিক সেন্টার সহ আরও সামাজিক সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংস্থা ও সংগঠনের সাথে কাজ করেছেন। স্বপ্নচারি এ মনীষির জীবনের একটি স্বপ্ন ছিল এদেশে সুদ বিহীন ব্যাংক ব্যবস্থা কিভাবে চালু করা যায়। তার এ স্বপ্ন দীর্ঘদিন যাবৎ লালন করে  ইসলামিক ইকোনমিক রিসার্চ ব্যুরো গঠন করেন। সময় যেতে থাকে, শাহ আব্দুল হান্নান ও এ ব্যাপারে পাতার আড়ালে থেকে সরকারী গুরুত্বপূর্ন দায়িত্বে থাকার পাশাপাশি এগিয়ে যান অভিষ্ঠ লক্ষ্যে।
 
অবশেষে ইসলামি ব্যাংকের আবেদন ১৯৮৩ সালে তৎকালীন সরকারের সুমতি হয়ে মাত্র কয়েকদিনের জন্য সুযোগ দেন। বলা হয় এ সময়ের মধ্যে জমানত জমা দিয়ে পূর্নাঙ্গ ব্যবস্থা করতে পারলে ইসলামী ব্যাংকের অনুমোদনের সুযোগ এদেশে দেয়া হবে। যে কথা সেই কাজ, ভাষা সৈনিক ও সাবেক আমিরে জামায়াত অধ্যাপক গোলাম আযমের সহযোগীতায় দেশ বিদেশের অনেকের আর্থিক সমন্বয়ের মাধ্যমে ঐ বছরই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ইসলামি ব্যাংক বাংলাদেশ লিঃ অনুমোদন ও কার্যক্রম শুরু করেন। শাহ আব্দুল হান্নান চাচার চিন্তা ও স্বপ্ন বাস্তবায়ন অনেক জায়গাতেই সম্ভব হয়েছে।
 
তিনি ইঞ্জিনিয়ার না হলেও ইঞ্জিনিয়ার তৈরি করেছেন। ডাক্তার না হলেও দেশে-বিদেশে অবদান রাখছেন এমন অসংখ্য প্রথিতযশা সফল ডাক্তার নিজে তৈরি করেছেন। তিনি ডক্টরেট অর্জন না করলেও হাজারো মেধাবী তরুনের তিনি গাইড হিসেবে কাজ করেছেন। যারা আজ দেশের বিভিন্ন বিশ^বিদ্যালয়ের স্বনামধন্য শিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন। যারা প্রশাসনে যেতে চেয়েছে, তিনি তাদের সেভাবেই গাইড দিতেন। এসব ক্ষেত্রে বিদেশের মাটিতে বিরাট সংখ্যক মেধাবী তরুন-তরুনী অবস্থান করছেন যারা চাচার একান্ত সন্তানতুল্য ছাত্র-ছাত্রী। একটা বিষয় তুলে ধরা অতীব জরুরি, তিনি যখন ইস্কাটনের বাসায় থাকতেন, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল এবং বুয়েটের অধ্যয়নরত মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে তার বাসায় বিষয়ভিত্তিক ক্লাস করাতেন। সেখানে দুটি বিভাগ ছিল। ছাত্রদের জন্য pioneer এবং ছাত্রী বোনদের জন্য witness নামে বিশেষ প্লাটফর্ম গঠিত করে বুদ্ধিভিত্তিক ক্লাস পরিচালিত হতো। এখানে ঢাকার বাইরের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আদর্শিক ভাইয়েরাও যোগ দিতেন। প্রতিভাবান ছাত্র-ছাত্রীরা সে ক্লাসে যোগ দিয়ে চাচার আলোচনায় মুগ্ধ হয়ে ইসলামি জ্ঞানার্জন, জীবন যাপনে অনুপ্রানিত হতেন। ছাত্র-ছাত্রীরা সবাই শাহ আব্দুল হান্নান কে চাচা বলে ডাকতেন এবং চাচা সবাইকে আপন ভাতিজা-ভাতিজির মতো পরমস্নেহের সাথে সাহচর্য দিতেন।
 
একটু না বললেই নয় আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সুবাদে চাচার ইস্কাটনের বাসায় যাতায়াতের সুযোগ হয়। সেসময় হল এ অবস্থানরত আমরা বড় একটা গ্রুপ চাচার ক্লাসে নিয়মিত যেতাম। যার ফলে চাচাকে কাছ থেকে জানার সুযোগ হয়েছে। এছাড়া আমার দুইটি সেমিনারে প্রবন্ধকার ও একটা সেমিনারে আলোচক হিসেবে চাচাকে প্রধান অতিথি হিসেবে পাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে। তিনি ছোট বাক্যে অতি সংক্ষিপ্ত অথচ তাত্ত্বিক বক্তব্য দিতেন। যা অন্য কোন মানুষের পক্ষে এমন সহজ ও সুন্দর বক্তব্য দেয়া সম্ভব নয়। লেখার মোড় ঘুরে অন্যদিকে চলে এসেছি, বলছিলাম মেধাবীদের নিয়ে বাসায় ক্লাসের কথা। আমি তামিরুল মিল্লাত মাদরাসা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক উচু মানের শিক্ষকদের কাছে পড়েছি। কিন্তু এমন কিছু জটিল বিষয়ে চাচার মত সহজভাবে উপস্থাপনা আর কারো কাছে পাইনি। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে উসুলে ফিকাহ, মানতিক আরো কিছু বিষয় রয়েছে কোরআন হাদিস নিয়ে। অনেক কঠিন বিষয়ে মাদরাসা পড়ুয়া স্কলাররা ও যে বিষয়ে এখনো বিতর্কের মাঝে আছে। শাহ আব্দুল হান্নান চাচার সাহচার্যে সে সব বিষয়গুলো আমাদের নতুনভাবে জানার ও বুঝার সুযোগ হয়েছে। তার চিন্তা চেতনার আলোকে উসুল ফিকাহর উপর তিনি বেশ লেখালেখি করেছেন। সর্বশেষ ফিকাহর উপর বই ও উপহার দিয়েছেন। তিনি যে কত বড় মনের মানুষ ছিলেন তা একটা উদাহরনে অনুধাবন করা যায়। একদিন বিকালে pioneer এর একটা ক্লাস হবে, আগ থেকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে উসুলে ফিকাহর নির্দিষ্ট বিষয় পড়ে আসতে হবে। আমরা যারা সদস্য তারা সময়মত উপস্থিত হতাম। চাচা অফিসের কাজে ব্যস্ত থাকায় যথাসময়ে উপস্থিত হতে পারেননি। আমাদের গ্রুপের লিডার ছিল হাসান শহীদ ভাই। তিনি যোগাযোগ করতে চেষ্টা করছেন। কিছুক্ষনের মধ্যে চাচা আমাদের মাঝে ঢুকে জোরে সালাম দিয়ে বিরাট হাসি, বললেন, “তোমরা কেমন আছো? আমার বড্ড বিলম্ব হয়েছে, তোমরা কষ্ট পেয়েছো? দেখো আমার যথা সময়ে আসা হয়নি বলে তোমাদের চাচির কাছে নিজেই কান মলে এলাম। একজন বড়মনের সফল মানুষের এ কাহিনি যে কি মজার তা তার সাথে না মিশলে বুঝা দায়। একজন সচিব, দেশের সর্বোচ্চ বড় কর্মকর্তা কিন্তু তার মধ্যে যে আচরনে পরিবারের মধ্য বিনোদনের পরিবেশ সৃষ্টি করা যায়, তা হান্নান চাচার জীবন দেখে বুঝা যায়।
 
চাচা ইসলামি অর্থনীতির আন্দোলনের পাশাপাশি মেধাবিদের গাইড দেয়া এবং ইসলামি সাহিত্য-সংস্কৃতির আন্দোলনের ক্ষেত্রে নতুন এক গতি সঞ্চার করেন। তিনি বড় কবি সাহিত্যিক না হলেও হাজার হাজার কবি সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব গড়ে তুলেছেন। পাশাপাশি মিডিয়ার ক্ষেত্রে সাংঘাতিক গুরুত্ব দিয়েছেন। যার ফলে মিডিয়ার ক্ষেত্রে বিরাট সংখ্যক সাংবাদিক, কলামিস্ট তৈরির ক্ষেত্রে তিনি ভুমিকা রেখেছেন। চাচা সাহিত্য সাংস্কৃতির কোনো প্রোগ্রাম বাদ দিতেন না। প্রোগ্রামের কথা জানানোর সাথে সাথে ডাইরিতে যথাযথভাবে সময় লিখে নিতেন। সেমিনারে কোনোদিন বিলম্ব করতেন না। যথাসময়ে হাজির হতেন। এদেশের মধ্যে সাহিত্য সংস্কৃতির পুরোধা ব্যক্তিরা প্রধান অতিথি হলে দেখা যায় প্রোগ্রাম চলাকালে বা শেষ দিকে আসেন। সেক্ষেত্রে হান্নান চাচা ছিলেন এক ব্যতিক্রমধর্মী মানুষ।  যথাসময়ে সবার আগে উপস্থিত হয়ে সময়ানুবর্তিতার ব্যপারটি সবাইকে তাক লাগিয়ে দিতেন। তিনি ইসলামি সংস্কৃতি নিয়ে চমৎকার বক্তব্য দিতেন।
 
২০০৩ সালের ১৮ নভেম্বর ‘ইসলামি সংস্কৃতি; প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেন “বাংলাদেশের মুসলিম জনগন ইসলাম ভিত্তিক জীবন যাপন করেন। তাই তারা তাওহিদ ভিত্তিক সংস্কৃতি চাইবেন স্বাভাবিক। এতে কারো বাধা দেয়া যুক্তিসঙ্গত নয়। মুসলমানদের আনন্দ ইসলামের সংস্কৃতির মধ্যেই নিহিত। আমাদের কোনো বিষয়ে বাড়াবাড়ি না করে ইতিহাস বোঝা দরকার। ইতিহাস থেকে জানতে পারি আর্যদের ক্রোধ এবং হিংসার কথা। ধর্মে-ধর্মে বিভক্তির কথা। এ অবস্থায় মানুষের সংস্কৃতিতে প্রথমেই মানবতাকে ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন।
 
তিনি আরও বলেন, “আজকাল আমরা প্রায়ই অপসংস্কৃতির কথা শুনে থাকি। অপসংস্কৃতির জয় জয়কারে আমরা এখন ভীত ও আতংকিত। সুস্থ ও নিরাপদ জীবনযাপন এখন আমাদের কাছে আকাঙ্খার বিষয়। কিন্তু আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি কেন সমাজে অপসংস্কৃতি ও অসুস্থতার আবির্ভাব? আসলে সমাজে যদি সুস্থ সাংস্কৃতির কর্মকান্ড জোরদার করা যায়। তাহলে অপসংস্কৃতির বদলে সুস্থ সংস্কৃতির স্পন্দনে আমাদের মন-মানস ও সমাজ হতো স্পন্দিত।
 
শাহ আবদুল হান্নান চাচা ছিলেন এ জাতির একজন নিভৃত অভিভাবক। শুধু মুসলমান নয় অন্যান্য ধর্মের লোকেরাও চাচাকে ভীষন রকম পছন্দ করতেন। তিনি ও সবার সাথে অবলিলায় মিশে যেতেন। একজন অভিভাবক হতে হলে সবার খোজ খবর রাখা এবং সকলের সুখ দুঃখের সাথি হওয়া একান্ত বাঞ্চনীয়। সেক্ষেত্রে এদেশের সাধারন জনতার মধ্যে ছাত্র-ছাত্রী, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষাবিদ, দার্শনিক, ইতহাসবিদ, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সর্বোপরি মানুষের সাথে তার ছিল নিবিড় সম্পর্ক। অপরপক্ষে সকল পেশাদার মানুষ আসতেন জানার জন্য, শেখার জন্য, যথার্থ পরামর্শ পাওয়ার জন্য। চাচা অতি ব্যস্ততার মাঝেও কাউকে ফিরাতেন না। তিনি দিনমজুর থেকে শুরু করে সমাজের উচুমানের মানুষ সবার অবস্থা বাস্তবতা অনুধাবনের ক্ষমতা রাখতেন। একজন মাদ্রাসা পড়–য়া মাওলানা যখন তার কাছে আসতো তখন তার সাথে সেভাবে কোরআন হাদিসের ভাষায় সেভাবে কথা বলতেন এবং তার সমাজে করনীয় দিকনিদের্শনা দেয়াই ছিল তার একান্ত কাজ। যেমন ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার বা সাধারন শিক্ষাবিদ কেউ এলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সেভাবে কথা বলতেন। সমসাময়িক বিষয় নিয়ে কিভাবে সমাধান ও উত্তোরন সম্ভব, পরামর্শ করে তাদের কেও ঠিক এমন দিশারি হিসেবে পরামর্শ নিতেন। একটা মজার বিষয় হল অভিভাবক তুল্য চাচা যেন সবার পিতা এবং স্নেহের পরশ মাখিয়ে দিতেন সর্বদা। আর যত বার গিয়েছি, নতুন ভাবে পেয়েছি এ এক আশ্চর্যের ব্যাপার। অতঃপর যখন কথা বলতেন, তখন অবশ্যই ঐ ব্যক্তিকে মনে করতে হয়েছে পৃথিবীতে তাকেই যেন সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন।
 
নির্মোহ, নিঃস্বার্থ ও নিরহংকার এ সফল মানুষটি সম্পর্কে কিছু বিশেষ কথা না তুলে ধরলে অপূর্নাঙ্গ থেকে যাবে। তিনি দায়িত্বের ব্যপারে এতটাই সচেতন এবং অতি সতর্ক থাকতেন যে সরকারি কোনো সফরে গেলে তার জন্য নির্ধারিত থাকার জায়গা বা খাবার থাকতো, তিনি সেটা বেশিরভাগ ই গ্রহন করতেন না। তিনি বলতেন আমি সাধারন মানুষের কাতারে থাকতে চাই। বিদেশে সরকারী ব্যবস্থাপনায় গেলেও সংশ্লিষ্ট হোটেলে হয়ত থাকলেও বাইরে সাধারন খাবার বা ফল-মূল খেয়ে কাটাতেন। নামি-দামি খাবার খেতে চাইতেন না। চাচার সহকর্মীদের কাছে জানা গেছে যে দেশের বাইরে গেলে শুকনা খাবার সাথে নিয়ে যেতেন যা দামি খাবারের আড়ালে সাথে নেয়া বিস্কুট ও ফল-মূল খেতেন। দেশের মাটিতে তিনি বিভিন্ন স্থানে পেশাগত দায়িত্বের কারনে সফর করেছেন কিন্তু সার্কিট হাউস বা মানসম্মত হোটেলে থাকতে চাইতেন না। পরিচিত কোন বাসায় বাসায় অবস্থান করে কাজ শেষ করতেন। জীবনে কোনো চাওয়া পাওয়া তার একদম ছিল না। তার সময়ে একজন সচিব হিসেবে বা বাংলাদেশে ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ও রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান হয়েও সরকারের কাছে কত সুযোগ সুবিধা নেওয়া যেত! চাচা কখনোই সে পথে পা বাড়াননি। তিনি একজন মুমিন হিসেবে বেচে থাকার জন্য যতটুকু দরকার তার বেশি আশা করেননি। অনেক সুযোগ এলেও তিনি গ্রহন করেননি। এমনি সততার চাদরে মোড়ানো জীবন হওয়ায়, জীবনে অনেক কঠিন বাধা অতিক্রম করতে হয়েছে চাচাকে।
 
শাহ আবদুল হান্নান চাচা সর্বদাই একজন দায়ি হিসেবে কাজ করতেন। অফিসে, বাসায় অথবা বিয়ের অনুষ্ঠানে গেলেও অন্তত একটা লিফলেট দিতেন। যা তার চিন্তা চেতনার কোন বিশেষ মতামত ও করনীয় বিষয়ে লেখা থাকত। কাছে যাওয়া মানেই কোন বই বা নিজের লেখা লিফলেট হাতে ধরাবেই। যাহোক, যখন যারা চাচার সান্নিধ্যে যেতেন সকলের জন্য বিশেষ কয়েকটা কথা তিনি সমানভাবে বলতেন। বিশেষ করে আজকে যারা চাচার সান্নিধ্য লাভে ধন্য হয়েছে, সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে, সকলের কাছে এ কথাগুলো দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট।

১.পড়া বেশি বেশি। বিশেষ করে ইসলামি দুনিয়ায় স্কলারদের নিত্ত-নতুন চিন্তা প্রসূত সফল বই ইসলামি সাহিত্য, ইসলামি অর্থনীতি সংস্কৃতি ও মিডিয়া সম্পর্কিত বই বেশি করে পড়। বলতেন মহাকবি ইকবাল, ওমর চোপড়া, সাইয়েদ কুতুব, ইউসুফ আল কারজাভি, সহ বর্তমান সময়ের ইসলামি গবেষকদের বই সংগ্রহ কর এবং পড়।
২.দাওয়াতি কাজ কর বেশি করে। যেখানে যে অবস্থায় থাক না কেন, মানুষের কাছে পৌছাও, দাওয়াত দাও, মানুষকে বুঝাও, তাদের সুখে দুঃখে আপনজন হয়ে যেতে হবে। মূল সংগঠন সব কাজ করতে পারবে না। বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করে দাওয়াতি কাজ বাড়ানো দরকার। কাউকে দায়ী কর না, বরং কল্যানমুলক পরামর্শ দাও।
৩.পড়ার পাশাপাশি লিখতে হবে নিয়মিত। অন্ততঃ মাসে ১টা লেখা উপহার দাও। তাহলে পাঁচ বছরে ভালো একটি বই করতে পারবে। আর যদি লেখতে না পারো তাহলে বক্তিতা দাও বা বেশি বেশি বলার চেষ্টা করতে হবে।
৪.কারো ওপর নির্ভর করো না। অধ্যয়নের পাশাপাশি যেকোন ভাল পেশা পছন্দসই যোগ্যতা অর্জন কর। হয়ত ভালো লিডার না হলে ভালো কর্মী হবে।
৫.কোনো কাজে আবেগি বা বাড়াবাড়ি করা যাবে না। নিয়মতান্ত্রিক ভাবে চলতে হবে।

পরশপাথর সম দুরদর্শী মানুষ শাহ আবদুল হান্নান চাচা। তিনি যখন যে কর্মস্থলে কাজ করেছেন, সেখানেই তার নৈতিক রাজত্ব কায়েম করেছেন। সর্বজ্ঞানে গুনান্বিত হান্নান চাচা আজ আমাদের মাঝে নেই। যা আছে তার চিন্তা-চেতনা ও দাওয়াতি জিন্দেগির কিছু স্মৃতি। রেখে গেছেন অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী যারা সারা বিশে^ বিভিন্ন ভাবে তার চিন্তাকে কাজে লাগানোর প্রত্যয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। চাচা যে সমস্ত চিন্তা দেশ-জাতির জন্য করতেন, মুসলিম উম্মাহের জন্য সর্বদা মাথায় নিয়ে কথা বলতেন, সে বলা আর নিদের্শনা কোনোদিন পাব না। এজন্য চাচার চিন্তা কাজে লাগানো এবং মুসলিম উম্মাহর সংকট কালে তার রেখে যাওয়া ছাত্র-ছাত্রীদের এগিয়ে আসা দরকার। তার মত আবদুল হান্নান জাতির ক্রান্তিকালে বড়ই প্রয়োজন। তার নির্দেশনাকে সামনে রেখে যাওয়া কাজগুলো আঞ্জাম দেয়ার পরিবেশ তৈরি করা, দেশ বিদেশের সবাইকে সুসংগঠিত হওয়া এখন সময়ের অনিবার্য দাবি। অনলাইনের সহজ উপায় কাজে লাগিয়ে নতুন নতুন চিন্তা কাজে লাগানো অনেকটাই সহজ। হান্নান চাচার রেখে যাওয়া গুনগ্রাহি অনুসারি ছাত্রদের একান্ত স্নেহধন্য যারা ছিলেন, তারা বিশ্বের আনাচে কানাচে থাকলেও একসাথে কাজ করার অনুরোধ সবার প্রতি। এ কামনা আমাদের সকলের। 

লেখক-আবুল কালাম আজাদ
অধ্যক্ষ ও গবেষক