ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:
ব্রেকিং নিউজ
  • মালয়েশিয়ায় সর্বাত্নক লকডাউনের ঘোষণা
  • সোহবত ছাড়া দাওয়াত ফলপ্রসূ হয় না
  • দশ মিনিটে ক্যান্সার পরীক্ষা, হার্ভার্ডে ডাক পেলেন আবু আলী
  • দ্বিতীয় শ্রেণিতে পাশ করেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক!
  • দেশে নতুন সেনাপ্রধান এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ

২৯ মে ২০২১, ১৬:০৫

জীবন তরঙ্গ

নতুন সফরে পাল তুলে দাও হে মাঝি সিন্দাবাদ

17794_777.jpg
বছর খানেক মাত্র হলো আমি অগ্রনী ব্যাংকে জয়েন করেছি প্রবেশনার অফিসার হিসেবে । ১৯৮১ সালের মাঝামাঝি আমাকে আবার বদলী করা হলো গৌরনদী শাখায়। এবারে আমি গৌরনদীতে বাসা ভাড়া করে বউ বাচ্চাদের নিয়ে সংসার পাতলাম। আমি তখন দুই কন্যা ও এক পুত্রের জনক। পাঁচজনের সংসার পাতলাম মাওলানা সামছুল হক সাহেবের বাড়িতে একটি বড় আটচালা ঘরের একাংশে। মাওলানা সামছুল হক আমার আপন ফুফাতো ভাই এবং উত্তর বরিশালের প্রখ্যাত আলিমে দীন ও মুফাসসিরে কুরআন। মায়ের তত্ববধান থেকে এই প্রথম বারের মত বাইরে এলাম। প্রথম দু’দিন কেমন যেন একটা শূন্যতার অনুভুতিতে ছেয়ে গেল মন। মায়ের হাজারো স্মৃতি বার বার ভেসে উঠতো মানস পটে কিন্তু পৃথিবী এমন এক জায়গা যেখানে কোনো কিছুই থেমে থাকে না। কতটা শূন্যতায় ছেয়ে ছিল সেদিন আমার বাবা মায়ের বুক তা উপলব্ধি করার মত সময় ও অবস্থা আমার তখন ছিল না। আমি ব্যস্ত চাকুরে , নিজের বউ ছেলে-মেয়ে নিজের কাছে নিয়ে এসেছি- এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু সন্তান কাছ থেকে দূরে গেলে যে বেদনা পিতা মাতার বুকে তোলপাড় করে সেটা বুঝতে পেরেছি যখন আমার মেয়েরা তাদের সংসারে চলে গেছে।
রান্না করার ছোট দু’ তিনটি হাড়ি, খান কয়েক থালা বাসন , প্রয়োজনীয় কাঁথা বালিশ আর তিনটি সন্তান এই ছিল আমার তখনকার সংসার । দুটো রিক্সায় আরোহীসহ পুরো সংসার সামাল হয়ে গেল । মাওলানা সাহেবের বদান্যতায় প্রাপ্ত দুখানা কাঠের তক্তপোশে আমাদের ঘুমানোর ব্যবস্থা হলো । এ ভাবেই আমাদের নতুন সংসার জীবন শুরু হলো বলা যায় অনেকটা শূন্য থেকেই ।


আমার স্ত্রী আজও অনেক সময় স্মৃতিচারণ করেন এই বলে যে , ‘গোটা কয়েক হাড়ি-বাসন নতুন বাসার এক কোনে জড় করা দেখে , বাড়িতে আমার শ্বশুর শাশুড়িসহ বিরাট সংসারের যাবতীয় স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে উঠলো আর এক অব্যক্ত বোবা কান্নায় হৃদয়টা দুমড়ে মুচড়ে ভেঙে যেতে থাকলো । শ্বশুর-শাশুড়ি , দেবর-ননদ , অতিথি-মেহমানে সরগরম সংসার ছেড়ে মনে হলো যেন বনবাসে এসেছি ।’ এভাবেই শুরু হলো আমাদের সংসার নামক নতুন সফর । বলা অপ্রাসঙ্গিক হবেনা আমার এ সংসারে আসবাব আর মালামালের প্রাচুর্য কোনো কালেই তেমন ছিল না ; এখনও নেই । কিন্তু আল্লাহর অফুরন্ত রহমত আর আমার মা বাবার দোয়ায় এ সংসার স্নেহ মমতা ও প্রেম-ভালবাসায় ছিল টই টুম্বুর ! বলা যায় এক সুখ-স্বপ্নের মধ্য দিয়েই কেটে গেল প্রায় চল্লিশটি বছর ।


ছায়া ছবির রিলের মতই আজও ভেসে ওঠে সেই দৃশ্য মনের কোনে ! তিনটি শিশু , কিছু হাড়ি-বাসন , কাঁথা বালিশ ও আমরা দু’জন আরোহী নিয়ে দু’টি রিক্সা চলতে শুরু করলো । শৈশব-কৈশোর ও প্রথম যৌবনের অযুত স্মৃতি বিজড়িত আমার প্রিয় প্রাঙ্গন , আমার বাড়ি , আমার ঠিকানা অদৃশ্য হয়ে গেল । পেছনে রইলো মা-বাবা ভাই বোনসহ আপনজনেরা । চোখের অশ্রু লুকিয়ে হাসিমুখে মা-বাবা দোয়া করে বিদায় দিলেন তাদের প্রথম সন্তান ও পুত্রবধুকে নতুন সংসার পানে । জন্মের পর থেকে যে ঘরটাই ছিল সব আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু , যে বাড়িটির পানেই তীব্র আকর্ষণে পা দুটো স্বয়ংক্রিয় ভাবে চলতে শুরু করতো সকল গন্তব্য থেকে , এখন আরও একটা অস্থায়ী ঠিকানা হলো এবং বলা যায় এই অস্থায়ী ঠিকানাটাই সকল কর্মতৎপরতার মূল কেন্দ্র হয়ে গেল। সাতাশ বছরের অবিচ্ছিন্ন সম্পর্কে ছেদ পড়লো বাড়ির সাথে । পৈত্রিক ভিটা থেকে সেই যে বের হলাম , আর সে অনুভূতি নিয়ে ফেরা হলোনা জীবনে । সেদিন কিন্তু এমন করে বুঝতে পারি নি । এর পর বাড়ি হয়ে গেল বেড়াতে যাওয়ার ঠিকানা ; অবসর -অবকাশে যাওয়ার জায়গা । একদা ভাবতাম চাকুরী জীবন শেষ হলে আবার ফিরে আসবো ছায়া ঘেরা গাঁয়ের এই মায়া ভরা গৃহ কোনে । কিন্তু তাও তো আর হলো না । জীবন তরী ভাসতে ভাসতে কোন কুলে যে ভিড়বে তা কি মানুষ জানে ? আমিও জানতাম না - জানি না ।


জীবনের অপর বেলায় এসে আজও সেই বাড়ি , সেই ঘর আমায় প্রচন্ড আকর্ষণে টানে ! সময় ও সুযোগ পেলেই ছুটে যাই সেই গৃহ পানে । কিন্তু যে চোখগুলোর স্নেহ ও আদরে সিক্ত হতাম আমি , সে চোখগুলোর বেশির ভাগই বন্ধ হয়ে গেছে চিরদিনের জন্য । হারিয়ে গেছেন স্নেহপরায়ন বাবা ,মমতাময়ী মা’সহ আমার সেই অতি প্রিয়জনেরা ! তারপরও সুযোগ পেলেই ছুটে যাই সেই গৃহ কোনে , সেই আবাসে । সেখানে যে এখনও আমার মায়ের হাসির ঝিলিক খুঁজে পাই - পাই বাবা, চাচা ও দাদার ঘামের গন্ধ !

নুরুল ইসলাম খলিফা
ব্যাংকার, সাবেক ডিএমডি
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিঃ