ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:
ব্রেকিং নিউজ
  • মালয়েশিয়ায় সর্বাত্নক লকডাউনের ঘোষণা
  • সোহবত ছাড়া দাওয়াত ফলপ্রসূ হয় না
  • দশ মিনিটে ক্যান্সার পরীক্ষা, হার্ভার্ডে ডাক পেলেন আবু আলী
  • দ্বিতীয় শ্রেণিতে পাশ করেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক!
  • দেশে নতুন সেনাপ্রধান এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ

মুহাম্মাদ বশির উল্লাহ (তুরস্ক)

২৯ মে ২০২১, ১৫:০৫

ওসমানীয় খিলাফতের সর্বশেষ রাজপ্রাসাদ `দোলমা বাহচে প্যালেস'

17792_Dolmabahce.jpg

দোলমা বাহচে প্যালেস যা ওসমানীয় খিলাফতের সর্বশেষ রাজপ্রাসাদ হিসেবে পরিচিত। সুলতান আব্দুল মাজিদের শাসন আমলে এই প্রাসাদটি নির্মান করা হয়েছিলো এবং সর্বশেষ ওসমানী খিলাফতের পতনের পরে শেষ সুলতান খলিফা আবদুল মাজিদ এফেন্দি এই রাজপ্রসাদ ছেড়ে যান। অনেকের ভাষ্যমতে সুলতান আব্দুল মাজিদ হত্যার পরে পরবর্তী খলিফাদের কেউ এই রাজপ্রাসাদে ছিলেন না। শুধুমাত্র পরবর্তী সুলতান আব্দুল আজিজ ২৩৬ দিন এই প্রাসাদে অবস্থান করেছিলেন, এরপরে তিনি তার দরবারকে আরেকটি প্রাসাদে স্থানান্তর করেন। পরবর্তী খলিফারাও শুধুমাত্র বিভিন্ন উৎসব এবং ঈদ উপলক্ষ ছাড়া এই  প্রাসাদে তেমন একটা যেতেন না।

কিন্তু আরেকটি বর্ণনায় এসেছে যে পরবর্তী সুলতানরা এখানেই অবস্থান করেছেন। তবে এটি নির্মাণের পূর্বে এর আরেকটি ইতিহাস ছিল। যে অঞ্চলে এই রাজবাড়িটি নির্মিত হয়েছিল তথা “বেশিকতাশ” অঞ্চল, সেটি ইস্তাম্বুল বিজয়ের আগে একটি ছোট উপসাগর ছিল এবং এর আশেপাশের অঞ্চলটি ভালিকুলা রেজি হোর্তি (রাজ উদ্যানের ছোট উপত্যকা) নামে পরিচিত ছিল। দাবি করা হয় যে, ফাতিহ সুলতান মেহমেদের ইস্তাম্বুল বিজয়ের সাফল্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো তিনি জাহাজগুলোর নঙ্গর  কাজটি এই উপসাগর থেকেই শুরু করেছিলেন। এছাড়াও এই উপসাগরীয় অঞ্চলে তৎকালীন সময়ে সামুদ্রিক অনুষ্ঠানগুলি এখানেই অনুষ্ঠিত হতো।  

কিন্তু কিছুকাল পর এই অঞ্চলটি আস্তে আস্তে পানির নিচে চলে যায় এবং একসময় এসে পুরোপুরি বিলীন হয়ে যায়। ১৭শ’ শতাব্দীতে এসে ওসমানীয় খিলাফতকালে এই অঞ্চলটি পুনরায় ভরাট করার কাজ শুরু হয়। ভরাট করার পরে উপসাগরটির নামকরণ করা হয়েছিল ‘হাসবাহচে’। ওসমানীয় সুলতানরা এই জায়গাটিকে বিশ্রাম ও বিনোদনের জন্য ব্যবহার শুরু করে। খলিফারা এই অঞ্চলে নিজেদের জন্য বিভিন্ন প্রাসাদ ও বিশ্রামাগার নির্মাণ কাজ করেন। এই প্রাসাদগুলো তখন ‘বেশিকতাশ বিচ প্যালেস’ হিসাবে পরিচিত ছিল। এভলিয়া ছেলেবির ভাষ্যমতে, দোলমা বাহচে প্রাসদ নির্মাণের পুর্বে ওসমানীয় খিলাফতের আরেক খলিফা ইয়াভুজ সুলতান সেলিম অবকাশ যাপনের জন্য এখানে একটি প্রাসাদ  নির্মাণ করেছিলেন। ওসমানীয় খিলাফতের ৩১তম সুলতান প্রথম আব্দুল মাজিদ এর শাসন আমল (১৮৩৯- ১৮৬১) এ এসে বেশিকতাশ তথা দোলমা বাহচে প্যালেস যেখানে অবস্থিত সেই উপকূলীয় অঞ্চলের প্রাসাদগুলি পূরাতন হয়ে গিয়েছে এবং সেগুলোর কার্যকারিতা কমে গেছে বলে মনে করা হয়। তখন সুলতানের নির্দেশে পুরাতন কাঠামোগুলো ভেঙে নতুন করে দোলমা বাহচে প্রাসাদ তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দোলমা বাহচে প্রাসাদ, যার নির্মাণ কাজ (১৩ জুন, ১৮৪৩- ৭ জুন, ১৮৫৬) প্রায় ১৩ বছরে শেষ হয়। একই বছর এই বিশাল প্রাসাদটিকে রাজপ্রাসাদ হিসেবে ব্যবহার করা শুরু হয়েছিল। এখান থেকেই রাজ্য পরিচালনা করা হতো। এটি ১১০ হাজার বর্গমিটার জায়গা নিয়ে নির্মিত এই প্রসাদটি বসফরাসকে সামনে রেখে নির্মাণ করা হয়েছে। যা আজ ইস্তাম্বুলের তৃতীয় বৃহত্তম প্রাসাদ ভবন হিসাবে খেতাব অর্জন করেছে। 

আর্মেনিয়ান স্থপতি গারাবেট আমিরা বালায়ণ এবং তার পুত্র নিগোগস বালায়ণ কর্তৃক নির্মিত এই প্রাসাদটিতে ইউরোপীয় স্থাপত্য শৈলীর মিশ্রণ রয়েছে। এই প্রাসাদটিতে ২৮৫ টি কক্ষ এবং ৪৩ টি হলরুম রয়েছে এবং দু’টি আকর্ষনীয় দরজা রয়েছে। সমুদ্র উপকূলের এই প্রাসাদের মাঝখানে একটি বলরুম ও একটি অনুষ্ঠানের হলরুম রয়েছে। প্রাসাদের গ্লাস প্যাভিলিয়ন একমাত্র জায়গা, যেখানে সুলতান মানুষের জীবন যাপন দেখতেন এবং সেনাবাহিনীর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতেন। প্রাসাদে সুদূর পূর্ব-ইউরোপীয় এবং তুরস্কের ঐতিহাসিক কারুকাজগুলো দেখা সম্ভব। পুরো প্রাসাদটিকে অগ্নিকুণ্ড, মোমবাতি এবং ঝাড়বাতির বিভিন্ন সৌন্দর্য্য বর্ধক উপাদান দ্বারা সজ্জিত করা হয়েছে। বলরুমে একটি দুর্দান্ত স্ফটিক ঝাড়বাতি রয়েছে যা ৩৬ মিটার উঁচু এবং এর ওজন সাড়ে চার টন। এই প্রসাদটি তৈরিতে খরচ হয়েছিলো তৎকালীন ৩৫ টন স্বর্ণ যা কিনা বর্তমান সময়ে ১.৩ বিলিয়ন ডলারের সমান। এবং এই অর্থের বড় একটি অংশই ছিলো বিদেশী ঋণ। আব্দুল মাজিদের শাসনামলে দূর্নীতি ঘুষ ইত্যাদি অনেক বেশী বেড়ে গিয়েছিলো যার ফলশ্রুতিতে অর্থনীতিতে ধস নামে। এক দিকে বিশাল ঋণের বোঝা অন্যদিকে দূর্নীতি ঘুষ ছাড়াও এই বিশাল রাজপ্রাসাদের রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয়ভার বেড়ে যাওয়ায় পরবর্তী সুলতান আব্দুল আজিজের শাসনামলে খেলাফত প্রায় দেউলিয়া হয়ে যায়। এবং আস্তে আস্তে খিলাফত ধ্বংসের দিকে দ্বার প্রান্তে পৌঁছায়।

তবে অটোমান খিলাফতের পতনের মূল কারণ ছিল এর সুলতানরা। সুলতানরা যতদিন শক্তিশালী ছিল ততদিন খিলাফত বিশ্বকে তার আদর্শ ও শক্তি দিয়ে শাসন করেছিল। সেই জীবনীশক্তি যখন ফুরিয়েছে, তখন মুখ থুবড়ে পড়েছে তাদের বিজয়ের রথ। একটি নির্দিষ্ট সময়ের পরে অযোগ্য সুলতানরা তাদের উজিরদের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। তাদের অটল আদর্শ এবং নৈতিক শক্তি দিয়ে বিশ্বকে শাসন করার পরিবর্তে তারা হেরেমের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। যদিও খিলাফত যোগ্য উজিরদের উপর নির্ভর করে চলেছিলো তবে দীর্ঘ সময় ধরে তারা অর্থনৈতিক, সামরিক, শিক্ষা, আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র এবং কৌশল সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পিছিয়ে যায়। তাদের ফল হিসাবে একসময়ে ইউরোপীয় শক্তির উপর নির্ভরশীল হতে হয়। কখনও তারা ফ্রান্সের সাথে, কখনও জার্মানীর সাথে, কখনও ইংল্যান্ডের সাথে মিত্রতা করেছিল। ফরাসী স্টাইলে সেনাবাহিনীকে গড়ার ও চেষ্টা করা হয়েছিল।

তবে গল্পটি ছিল অন্যরকম। সুলতান সুলাইমানের শাসনামলে, যখন স্প্যানিশ সরকার নেদারল্যান্ডসকে আক্রমণ করার হুমকি দিয়েছিল, নেদারল্যান্ডস প্রধানমন্ত্রী তখন  ওসমানী খলিফার কাছে সহযোগিতা চেয়েছিল। সুলতান সুলেমান তার সেনাবাহিনীর কাছে চল্লিশটি পোশাক প্রেরণ করেছিলেন এবং এই পোশাক পরে ডাচ সৈন্যদের পুনরায় মহড়া দেওয়ার জন্য বলা হয়েছিল। ওসমানী সেনাবাহিনীর পোশাক দেখে স্পেনীয় সেনাবাহিনী মনে করে যে সুলতান সুলাইমানের সেনাবাহিনী ডাচ বাহিনীতে যোগ দিয়েছে। তাই তারা ভয়ে ভয়ে পরবর্তী ৩০ বছর যুদ্ধ বন্ধ রেখেছিল। উসমানীয় খিলাফতের সেনাবাহিনীর বিশ্বব্যাপী খ্যাতি ছিল। তবে তারা তাদের ব্যর্থতায় মাত্র ২০০ বছরে পশ্চিমের রীতিতে তাদের নিজস্ব সেনাবাহিনী গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিল। ফরাসী বিপ্লব এবং পশ্চিমা সভ্যতার বিকাশ শুরু হওয়ার সাথে সাথে এই অঞ্চলে কিছু বাতাসের ঝাপটানি বইতে শুরু করে। ফলস্বরূপ, খিলাফাহ সংস্কার বা রাষ্ট্রের জন্য আন্দোলন শুরু হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত কোনো সংস্কারই খেলাফতকে ধ্বংস থেকে রক্ষা করতে পারেনি। পরের ১৩৫ বছরে খেলাফত শেষ হয় এবং তুরস্ক প্রজাতন্ত্র গঠিত হয়।

খেলাফত বিলুপ্তির সাথে সাথে শেষ সুলতান খলিফা আবদুল মাজিদ এফেন্দি এবং তার লোকেরা ১৯২৪ সালে প্রাসাদটি ছেড়ে চলে যায়। আধুনিক তুরস্কের প্রথম প্রেসিডেন্ট মুস্তফা কামাল আতাতুর্ক তার শাসনামলে মাঝেমাঝে প্রাসাদটি পরিদর্শন করতেন। তিনি আঙ্কারা থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা করার কারণে এই প্রাসাদ শুধুমাত্র অবকাশ যাপনের জন্য ব্যবহার করতেন। তবে প্রাসাদটি তখনকার সময়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। সংস্কৃতি এবং শিল্পের জন্য প্রাসাদের গেটগুলো বাইরের দিকে খুলে দেয়া হয়েছিল এবং বিদেশী অতিথিরা অর্থাৎ রাষ্ট্রপতিরা আসলে এখানে তাদের আপ্যায়ন করা হতো। তবে আতাতুর্ক তার শেষ সময়ে এই প্রাসাদেই চিকিৎসা করিয়েছিলেন এবং এখানের ৭১ নং কক্ষে ইন্তেকাল করেন। খিলাফত বিলুপ্তির পরে কামাল আতাতুর্কের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রথম ভাষা ও ইতিহাস কংগ্রেস এই প্রাসাদটিতেই অনুষ্ঠিত হয়। কিছুদিন পরে এটি আবার দীর্ঘ সময়ের জন্য জনসাধারণের জন্য বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তবে ১৯৮৪ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় প্রাসাদ সিম্পোজিয়ামে এটি নিয়ে আলোচনা সমালোচনা হয়েছিল এবং সেখানে নেয়া একটি সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে এটিকে  "জাদুঘরের অভ্যন্তরে যাদুঘর" হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয় এবং দর্শণার্থীদের জন্য খুলে দেয়া হয়। যা আজও দর্শণার্থীদের ভিড়ে মুখর থাকে। 

 

প্রাসাদের বৈশিষ্ট্যঃ

  • দোলমা বাহচে প্রাসাদটি একটি ৩ তলা বিশিষ্ট পরিকল্পিত বিশাল প্রাসাদ।
  • দোলমা বাহচে প্রাসাদে ২৮৫ টি কক্ষ এবং ৪৩ টি হলরুম রয়েছে।
  • প্রবেশপথের পাশে সুলতানকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য আলাদা একটি বিভাগ রয়েছে।
  • অভ্যন্তরে সিল্ক কার্পেট এবং সর্বোচ্চ মানের উপকরণ দিয়ে পর্দা সমূহ নির্মিত হয়েছে, আজ অবধি তাদের মৌলিকত্ব সংরক্ষণ করে।
  • প্রাসাদের দেওয়ালে ইউরোপীয় স্টাইলের কাজ দেখার পাশাপাশি সিলিং এবং অন্যান্য চারপাশে স্বর্ণ দিয়ে সজ্জিত অংশের দেখা মিলবে।
  • দোলমা বাহচে প্রাসাদের তলা সমূহ একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এবং সুন্দর।
  • বিশ্বের বৃহত্তম বলরুমটি দোলমা বাহচে প্রাসাদে অবস্থিত।
  • এটি চিত্রকর্ম এবং ভাস্কর্য প্রদর্শনীর যাদুঘর হিসাবে দর্শকদের আকর্ষণ করে।
  • এটি বর্তমানে তুরস্কের তৃতীয় বৃহত্তম প্রসাদ।
  • ওসমানী খিলাফত কালে ব্যবহৃত চিন, জাপান, ইউরোপের প্রায় ৩০০ চিনা মাটির বাসন, ৫৮১ রৌপ্য, ১৫৮ ঐতিহাসিক ঘড়ি, স্ফটিক ঝাড়বাতি ও কিছু রুপার তৈরি টেবিলের দেখা পাওয়া যাবে।
  • প্রাসাদের ভিতরের ফার্নিচারের অধিকাংশই তৎকালীন সময়ে ভারতবর্ষ, মিশর, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে পাঠানো হাদিয়া ছিলো।

এছাড়াও দেখার মতো শত শত বিষয় রয়েছে যা বর্ণনা করে শেষ করা যাবেনা। সুলতান আব্দুল মাজিদের ইন্তেকালের পরে এতো বিশাল প্রাসাদের অর্ধেকের বেশিই অব্যহৃত হয়ে পড়েছিলো। গুরুত্বপূর্ণ কিছু রুম ছাড়া বাকিগুলো ওভাবেই অযত্ন আর অবহেলায় নষ্ট হয়ে যায়। কেননা খিলাফত দেউলিয়া হয়ে যাওয়ায় এই বিশাল প্রাসাদ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য এতো অর্থ খরচ করা অসম্ভব হয়ে গিয়েছিল। যদিও আধুনিক তুরস্ক জন্ম নেয়ার পরে এটিকে নতুনভাবে সাজ্জিত করে তুলে এবং আরো বেশি  আকর্ষনীয় হয়ে উঠে দর্শকদের কাছে। প্রতিদিন হাজার হাজার দর্শকের প্রথম চাহিদার স্থান দখল করে আছে দোলমা বাহচে সায়ায়ি। আমন্ত্রণ থাকবে তুরস্কে আসার এবং দোলমা বাহচে প্যালেস ভ্রমন করার।

 

মুহাম্মাদ বশির উল্লাহ।

শিক্ষার্থী, ধর্মতত্ব বিভাগ।

কারাদেনিজ টেকনিক ইউনিভার্সিটি, তুরস্ক।