ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:
ব্রেকিং নিউজ
  • মালয়েশিয়ায় সর্বাত্নক লকডাউনের ঘোষণা
  • সোহবত ছাড়া দাওয়াত ফলপ্রসূ হয় না
  • দশ মিনিটে ক্যান্সার পরীক্ষা, হার্ভার্ডে ডাক পেলেন আবু আলী
  • দ্বিতীয় শ্রেণিতে পাশ করেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক!
  • দেশে নতুন সেনাপ্রধান এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ

মু. লাবিব আহসান

২১ মে ২০২১, ২০:০৫

‘সুখ-মৃত্যু’

17496_541122.jpg
ছবি- সংগৃহীত
হাসপাতালে আমাকে যে কেবিনটি দেয়া হয়েছে তার নাম্বার ৩১৮। ছিমছাম দুই বেডের একটি কেবিন। বিছানার চাদর ধবধবে সাদা। কোথাও কোনো নোংরার ছিটেফোঁটা নেই। ফিনাইলের গন্ধ আসছে। স্মৃতি উসকে দেয়ার ক্ষেত্রে গন্ধের জুড়ি নেই। ফিনাইলের গন্ধ আমাকে দূর শৈশবের কোনো একটি দৃশ্যে নিয়ে দাঁড় করিয়ে দিলো। ছোটাচ্চুর যখন অ্যাপেনডিসাইটিসের অপারেশন হয়েছিলো, তখন আমরা তাকে দেখতে হাসপাতালে গিয়েছিলাম। ছোটাচ্চু আমাকে দুটো কমলা আর একটা ডালিম খেতে দিয়েছিলেন। কমলা আর ডালিম খেতে খেতে আমি এমন একটি ঘ্রাণ পেয়েছিলাম। আজ এতোটা বছর পরে আবার সেই ঘ্রাণ আমার জীবনে ফিরে এসেছে দেখে কিঞ্চিৎ পুলকিত বোধ করলাম, কিঞ্চিৎ স্মৃতিকাতর হলাম।
 
আমার পাশের বেডের যে রোগীটি গতকাল পর্যন্ত শয্যাশায়ী ছিলেন, তিনি আজ সকালে মারা গেছেন। মৃত্যুর পর তার ছোট ছেলেটি বাবার হাত ধরে কাঁদছিলো। সেই হাতটি ধরে কাঁদছিলো, যে হাত তাকে পরম মমতায় হাঁটতে শিখিয়েছে। যে হাত তার ছোট ছোট হাতগুলো ধরে হয়তো গ্রামের বাজারে নিয়ে গিয়েছিলো একদিন। পছন্দের কত কিছুই কিনে দিয়েছে। আর মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করেছে, “কিরে ব্যাটা! রসমালাই খাবি?” হয়তো ঈদের আগের রাতে সাইকেলের ক্যারিয়ারে বসিয়ে বাজারে নিয়ে গিয়েছিলো নতুন জামা কিনে দিতে। আসার পথে ছেলেটি চাকার ভিতরে পা ঢুকিয়ে দিয়েছিলো আর বাবা বাকি পথ ছেলেকে কোলে নিয়েই সাইকেল চালিয়ে বাড়িতে ফিরেছে। বাবারা সত্যিই বড় বিচিত্র এক চরিত্র। জীবনভর সন্তানকে দিয়ে যান, নিয়ে যান না কিছুই।
 
পাশের বেডের বিছানার চাদর বদলানো হয়েছে। মৃতের সমস্ত স্মৃতি মুছে ফেলা হয়েছে মুহূর্তেই। সেখানে জায়গা পেয়েছেন এক মাঝবয়সী ভদ্রলোক। এই পৃথিবী মৃতের জন্য কোনো আয়োজন রাখে না। এই পৃথিবীর সমস্ত আয়োজন জীবিত মানুষের জন্য। আমার বেড থেকে বাইরের প্রকৃতি দেখা যায়। রোজ রোজ একই দৃশ্য দেখতে ইচ্ছে করে না। মাথা ঝিম ঝিম করে। তবুও মাঝে মাঝে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাই। আগ্রহ এবং অনাগ্রহের মাঝামাঝি কোনো অবস্থা নিয়ে তাকাই।
 
দূরে একটা বিল্ডিংয়ের দেয়ালে ঝুলে ঝুলে শ্রমিকরা রং করছে। বাসাটির ছাদে দুটো মাঝারি সাইজের পতাকা। একটা আর্জেন্টিনা আর একটা জার্মানীর। জার্মানীর পতাকার একটা কোন ছিঁড়ে গেছে। আমি দৃষ্টি ফিরিয়ে আনি আবার বইয়ের পাতায়। পড়ছি হুমায়ূন আহমেদের ‘নিশীথিনী’। আমার ধারণা ছিলো, মিসির আলী সাহেব চাকরি চলে যাওয়ার মতো তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামান না। কিন্তু ‘নিশীথিনী’তে দেখা গেলো তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরী চলে যাবার ঘটনায় ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান সাহেবের সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েছেন। মিসির আলী সাহেবের মতো মানুষের সঙ্গে কি এটা যায়?
 
সকালের প্রথম শিফটে একজন ডাক্তার দেখতে এলেন। তার মুখ হাসি হাসি নয়, গম্ভীর। ডাক্তাররা গম্ভীর হয়েই জন্মগ্রহণ করেন নাকি ডাক্তার হবার পর গম্ভীর হয়ে যান; তা এক প্রাগৈতিহাসিক গবেষণার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে তিনি গোটা জগৎ সংসারের সমগ্র মানবমন্ডলীর প্রতিই মহাবিরক্ত। বিরক্তি লুকানোর চেষ্টা করছেন কিন্তু পারছেন না। পারছেন না বলেই হয়তো তার মুখে খানিকটা লজ্জার আভা খেলা করে যাচ্ছে। বিরক্তি এবং লজ্জার যৌথ মিশ্রণে তাকে দেখতে লাগছে বিপ্লবী চে গুয়েভারার মতো।
 
তিনি এসে কপালে হাত রেখে বেশ কোমল কণ্ঠে বললেন, “শরীর কেমন লাগছে এখন?” আমি বিস্ময়াভিভূত হয়ে গেলাম। এমন গম্ভীর এবং বিরক্ত মানুষটির কণ্ঠ এমন কোমল হলো কি করে! আমি কণ্ঠে আরও কয়েকগুণ কোমলতা মিশিয়ে জবাব দিলাম, “জী ভালো, বেশ ভালো।” ডাক্তার চলে যাবার পর নার্স কিছু ঔষধ খাইয়ে বিদায় নিলো। কেবিনে পড়ে রইলাম আমরা দুজন।
 
পাশের বেডের মানুষটি আসার পর থেকেই ঘুমোচ্ছেন। ‘বেঘোরে ঘুম’ বলে যে একটা কথা আছে তা সম্ভবত এই লোকটির ক্ষেত্রেই যথোপযুক্ত প্রয়োগ করা যায়। ঘুমানোর সময় তার মুখ ‘হা’ হয়ে থাকে। দেখে মায়া লাগে। আচ্ছন্ন হয়ে যাওয়া মায়া নয়, দেয়াল না টপকানো মায়া। যে মায়াকে একইসঙ্গে গ্রাহ্য এবং অগ্রাহ্য করা যায়। যে মায়ায় নিজের জগতের সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায় না। জগৎ থাকে বহাল তবিয়তে।
 
আমি বালিশের পাশে থাকা আরেকটি বই হাতে তুলে নিলাম। বইয়ের নাম- ‘The rape of Bangladesh’. লিখেছেন বিখ্যাত ব্রিটিশ সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস। লোকটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস রচনায় যুগান্তকারী ভূমিকা রেখে গেছেন। তিনি এসব বই রচনায় হাত না দিলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস আরও খানিকটা বিকৃতির কবলে পড়তে বাধ্য হতো। আর আছে একটি অর্থসহ কোরআন শরীফ। মাঝে মাঝে প্রিয় আয়াতগুলো পড়ি। বিশেষ করে সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত। এতো সুখ লাগে! এই দুই আয়াত নাযিল করায় আল্লাহকে যে কতবার ‘Thank you’ বলেছি!
 
আমার স্ত্রী মিতু এসেছে দেখা করতে। হরেক পদের খাবার রান্না করে এনেছে। ওর চোখ অশ্রুসজল। মেয়েরা এমন মমতাময়ী হয় কেন কে জানে! আমার খুব প্রিয় মেন্যু ডিম ভাজি আর শুকনা মরিচ দিয়ে বানানো আলুর ভর্তাও নিয়ে এসেছে। ঠিক মতো খেতে দিতে পারছে না। ওর চোখ ভেসে যাচ্ছে মমতার অশ্রুতে। মিতুর বিয়ের কথাবার্তা চলছে। চলছে আমার শেষ ইচ্ছে হিসেবে। ঘটক আমি নিজেই। ডাক্তার বলেছে, আমি আর বড়জোর ১৭ দিন বাঁচবো। আমার মৃত্যুর পর বিয়ে হবে ওদের। আমি থাকবো না। ওদের পৃথিবী হবে আলো ঝলমলে। এর চেয়ে সুখের ব্যাপার কি পৃথিবীতে ঘটেছে কখনও?
 
লেখক: মু. লাবিব আহসান।