ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:
ব্রেকিং নিউজ

নিউজ ডেস্ক

১৮ ডিসেম্বর ২০২১, ১৩:১২

চট্টগ্রাম বিআরটিএ অফিসে ভয়াবহ রেজিস্ট্রেশন জালিয়াতি!

23052_7.jfif
সংগৃহীত
একটি টিআইএন (ট্যাক্সপেয়ার আইডেনটিফিকেশন নাম্বার বা করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর) দিয়ে ১০৩টি প্রাইভেট গাড়ি বিভিন্ন ব্যক্তির নামে রেজিস্ট্রেশন নেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম বিআরটিএ (বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি বা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ) অফিসে ঘটেছে এমন ভয়াবহ জালিয়াতির ঘটনা।


এসব গাড়ির মালিকদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে বিআরটিএ’র আঞ্চলিক কার্যালয়কে চিঠি দিয়েছে চট্টগ্রাম কর অঞ্চল। বিধান অনুযায়ী টিআইএন যার নামে কেবল ওই ব্যক্তিই নিজ নামে একাধিক গাড়ির রেজিস্ট্রেশন করতে পারেন।

আরও জানা গেছে, গত ২০ সেপ্টেম্বর জাল টিআইএনে গাড়ি রেজিস্ট্রেশন বন্ধে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (ন্যাশনাল বোর্ড অব রেভিনিউ বা এনবিআর) ও বিআরটিএ সমঝোতা চুক্তি সই করে। এ চুক্তির ফলে এনবিআর বিআরটিএ’র ডাটাবেজে রক্ষিত গাড়ির মালিকের নাম, ঠিকানা, টিআইএনসহ যাবতীয় তথ্য দেখার সুযোগ পাচ্ছে।

চট্টগ্রাম কর অঞ্চল এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে চট্টগ্রাম বিআরটিএতে রেজিস্ট্রেশন নেওয়া গাড়ির তথ্য যাচাই করে এক টিআইএন দিয়ে একাধিক গাড়ি রেজিস্ট্রেশনের প্রমাণ পেয়েছে।

বিআরটিএ’র ডাটাবেজ যাচাই করে দেখা গেছে, তানিয়া জেসমিন নামে মহিলার টিআইএন ব্যবহার করে ১০৩টি গাড়ি বিভিন্ন ব্যক্তির নামে রেজিস্ট্রেশন নেওয়া হয়েছে। কর অঞ্চল থেকে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তার একটি গাড়ি আছে। এত গাড়ি কিভাবে তার রেজিস্ট্রেশন দেওয়া হলো তা তিনি নিজেও জানেন না। এ বিষয়ে তিনি (তানিয়া) বিআরটিএ’র আঞ্চলিক কার্যালয়ে চিঠি দিয়েছেন।

বিশেষ সূত্র আরও জানায়, জাল টিআইএনে দামি গাড়ি রেজিস্ট্রেশনে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট রয়েছে। কিছু আমদানিকারক, বিআরটিএ’র কর্মকর্তা-দালালদের তৈরি এ চক্রের মাধ্যমে নিবন্ধন প্রক্রিয়া চলে। মোটা অঙ্কের ঘুস লেনদেনের মাধ্যমে এসব গাড়ির রেজিস্ট্রেশন করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম কর অঞ্চলের কমিশনার সৈয়দ মোহাম্মদ আবু দাউদ গণমাধ্যমকে বলেন, চট্টগ্রাম বিআরটিএতে নিবন্ধিত গাড়ির তথ্য যাচাই করে ভয়াবহ জালিয়াতির তথ্য পাওয়া গেছে। এ ধরনের আরও কয়েকটি টিআইএন পাওয়া গেছে, যেগুলো দিয়ে একাধিক গাড়ি রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছে। এগুলো চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে বিআরটিএকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিআরটিএ কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতা ছাড়া এক টিআইএনে ১০৩ গাড়ি রেজিস্ট্রেশন সম্ভব নয়। যেহেতু চট্টগ্রাম কর অঞ্চল অনিয়ম চিহ্নিত করতে পেরেছে, এখন উচিত হবে এর সঙ্গে যেসব কর্মকর্তা জড়িত তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা। পাশাপাশি যেসব মালিক জাল টিআইএনে গাড়ির রেজিস্ট্রেশন নিয়েছেন ভবিষ্যৎ নবায়নের সময় তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

সমঝোতা চুক্তির সুফল : গত বছরের শুরুতে কেন্দ্রীয় কর জরিপ অঞ্চল নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ হিসাবে বিআরটিএ থেকে এক হাজার ৮২১টি বিলাসবহুল গাড়ির তথ্য সংগ্রহ করে। এর মধ্যে ৮৯১টি গাড়ির রেজিস্ট্রেশন যাচাই করে দেখা যায়, ১২৬টি গাড়ি রেজিস্ট্রেশনে জাল টিআইএন ব্যবহার করা হয়েছে। এতে টনক নড়ে উভয় সংস্থার কর্তাব্যক্তিদের। সমন্বয়হীনতা দূর করতে দুই সংস্থা চলতি বছরের ২০ সেপ্টেম্বর সমঝোতা চুক্তি সই করে।

এতে বিআরটিএ গাড়ি রেজিস্ট্রেশনের আগে এনবিআরের ই-টিআইএন সার্ভারে ঢুকে গ্রাহকের টিআইএন সঠিকতা যাচাই করছে। পাশাপাশি এনবিআর বিআরটিএ’র ডাটাবেজে কোনো ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), টিআইএন বা গাড়ির নম্বর দিয়ে সার্চ দিলেই গাড়ির মালিকের বিস্তারিত তথ্য দেখতে পারছে। এ চুক্তির কারণেই চট্টগ্রাম কর অঞ্চলের ঘটনা ধরা পড়েছে।

কর কর্মকর্তারা বলছেন, গাড়ির রেজিস্ট্রেশনের হয়রানি থেকে বাঁচতে অনেক সময় মালিকরা দালালদের দ্বারস্থ হন। সেই দালালরাই এ ধরনের জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত। মূলত এক ব্যক্তির টিআইএন দিয়ে একাধিক গাড়ির রেজিস্ট্রেশন তারাই করছে। প্রকৃতপক্ষে এতে গাড়ির মালিকই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

যেমন ১৫০০ সিসির একটি গাড়ির ফিটনেস নবায়নকালে ২৫ হাজার টাকা অগ্রিম কর পরিশোধ করে ট্যাক্স টোকেন নিতে হয়। যা পরবর্তীকালে করদাতা রিটার্নের সঙ্গে সমন্বয় করতে পারে। কিন্তু যারা জাল টিআইএন ব্যবহার করে গাড়ি রেজিস্ট্রেশন নিয়েছে বা নিচ্ছে, তারা সেই অগ্রিম কর সমন্বয় করার সুযোগ পাচ্ছে না। শুধু অহেতুক ভীতির কারণেই তাদের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে।

শুধু তাই নয়, ভবিষ্যতে গাড়ির ফিটনেস নবায়নকালে আরও জটিলতায় পড়তে হবে। কারণ এনবিআর ও বিআরটিএ’র চুক্তির ফলে বিআরটিএ গাড়ির ফিটনেস নবায়নের আগে টিআইএনের যাচাই-বাছাই শুরু করেছে। এর ফলে যারা জাল টিআইনে গাড়ি রেজিস্ট্রেশন নিয়েছেন তাদের সড়ক আইনের পাশাপাশি আয়কর আইনেও জরিমানার মুখে পড়তে হবে।

আয়কর অধ্যাদেশেও জাল টিআইএন ব্যবহারের জন্য ব্যবহারকারীর ওপর আর্থিক জরিমানাসহ কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। ১২৪এ ধারা অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি অন্যের টিআইএন অথবা জাল টিআইএন ব্যবহার করেন বা আয়কর আইন অনুযায়ী যেসব ক্ষেত্রে টিআইএন ব্যবহার বাধ্যতামূলক, সেসব ক্ষেত্রে জাল টিআইএন ব্যবহার করলে সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা জরিমানা আরোপের বিধান রয়েছে।

অন্য দিকে সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান সেবা দেওয়ার সময় টিআইএন ভেরিফিকেশন না করলেও ওই প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা আরোপের বিধান রয়েছে। আয়কর অধ্যাদেশের ১২৪এএ ধারা অনুযায়ী সেবা প্রদানকালে টিআইএন সনদ যাচাই না করলে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানকে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা করতে পারে আয়কর বিভাগ। ১৬৫এ ধারা অনুযায়ী, ইচ্ছাকৃতভাবে যদি কোনো ব্যক্তি জাল টিআইএন ব্যবহার করেন বা অন্যের টিআইএন ব্যবহার করেন, সে ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীকে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে।