ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:
ব্রেকিং নিউজ

অহিদুর রহমান

১২ নভেম্বর ২০২১, ১৫:১১

ইসলামী বই মেলা পরিচ্ছন্ন জীবনের সহায়ক

22055_5.jpg
ছবি- সংগৃহীত
বই বলতে লেখা, ছাপানো অক্ষর, ছবি, ছবিবিশিষ্ট কাগজ অথবা অন্য কোনো মাধ্যমে তৈরি পাতলা শিট বা ডিজিটাল পৃষ্ঠার সমষ্টিকে বোঝায়। যা এক ধারে বাঁধা থাকে এবং মলাটের ভেতরে রক্ষিত থাকে। এর প্রতিটি পাতলা শিটকে পৃষ্ঠা বা পাতা বলে। আরবিতে বলে কিতাব। কিতাব মানে লিখিত বস্তু ও বিষয়। বইয়ের সমার্থক শব্দ গ্রন্থ, কিতাব, পুস্তক।

বই জ্ঞানার্জনের প্রধান মাধ্যম। বই মানুষকে হাসায় আবার কাঁদায়। বই পড়ে মানুষ তার মনের ক্ষুরাক যুগায়। মানুষের চিন্তার পরিবর্তন ঘটায়, পরিবর্তন ঘটাতে পারে একটি জীবনের । বই পড়ে ইতিহাস সভ্যতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। একটি জীবনে বইয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। আর এরকম প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেই সারা বিশ্বে আয়োজন করা হয় বই মেলা।

মেলা মানে, উৎসব। মেলা মানে, ক্রয়বিক্রয়ের হাট। সুতরাং বই মেলা হচ্ছে বই ক্রয়-বিক্রয়ের হাট। আর ইসলামী বই মেলা হচ্ছে ইসলামী বইয়ের ক্রয়-বিক্রয়ের উৎসব বা হাট।

বই হল অনুভূতি বিভূতি। বইয়ে সব আছে। আপনি যা চান, তা আছে। যা চান না তাও আছে। এখন পৃথিবীতে সাতশো কোটির উপরে মানুষ। সবার মনের চাওয়া-পাওয়া এক নয়। খাবারদাবার ও চিন্তাভাবনা ভিন্নভিন্ন। সেসব আমরা বাস্তবে দেখি ও জানি। সবিস্তার, সবিস্ময় ও সবিস্তৃত জানি বইয়ের অক্ষরে অক্ষরে।

পৃথিবীতে কতো কতো বিদ্বান ও বিজ্ঞানময় মানুষ ছিল, এখন নেই। তাদের আমরা বইয়ের পাতায় পাই। কতো জঘন্য ও নগন্য মানুষ পৃথিবীকে নগ্ন আঘাত করেছিল, তারা আজ নেই। তাদের দুর্বিষহ বিবরণ বইতে খোদাই করা আছে।

বই না থাকলে, আমরা নানান জাতি, নানা প্রজাতির কালচার, তাহযিব, সৃষ্টি ও অনাসৃষ্টি সম্পর্কে জানতাম? না।

মানুষ তার উপলব্ধি বলে যায়। বলা গল্প ফুরিয়ে যায়। চিন্তাশীল মানুষ চিন্তাকে বলে, লিখে, জমা করে। যাতে পরবর্তী মানুষ তার উপকার পেতে পারে। লেখালেখি না থাকলে, আমরা এখনো মহামারিতে মারা যেতাম। লিপিপদ্ধতি না থাকলে, প্রযুক্তি দূরের কথা, আমরা চাকা ও শিল্প সভ্যতার অগ্রগতি করতে অক্ষম থাকতাম।

বই মানুষের একান্ত ভাষ্য। মানুষ, সভ্যতা, সমাজ, ইতিহাস যাই কিছু বলেন না কেন তা জানতে হলে, বুঝতে হলে বই পড়ার বিকল্প নেই। কাছেপিঠে যাকে আপনার পছন্দ, তাকে, তার চিন্তাজগত আপনি টাচ করতে পারবেন। বহু দেশের কৃষ্টি আপনি অনায়াস বুঝতে পারবেন বইয়ের তাকে। মনীষা ও মনীষী বইয়ের মাঝে বৈঠক করেন নিয়মিত। আপনি পছন্দ ও অপছন্দ সকল প্রতিভা ও গার্ভেজকে বইয়ে সুচিহ্নিত করতে পারবেন। বস্তুত, বই ইতিহাসের সেতু। বই প্রকৃতির প্রকৃত মুকুর। বই জ্ঞানের দলিল, দলিলের প্রামাণ্য বাকসো।

আমি বই ছাড়া পৃথিবী অনুভব করতে পারি না। বই বাদ দিলে, পৃথিবীর অর্ধ সৌন্দর্যরূপ ফ্যাকাসে হয়ে আসে। বইহীন পৃথিবী বোবা, বধির ও অন্ধ। বই মানুষের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও নিরাপদ বন্ধু।মানুষকে যা বরেণ্য করে, বই তার গোড়াপত্তন করে দেয়। বই চিন্তা করার চশমা ও ল্যাবরেটরি। আর মানুষ চিন্তারাজ্যের শক্তিতে স্মরণীয় ও বরণীয় হয়। মানুষ দুই প্রজাতির। বইবান্ধব ও বইহীন। মানুষ বই ছাড়া হলে, পৃথিবী বুঝবে না। নিজেকেও অনালোকিত ও অচেনা রেখে মৃত্যুবরণ করবে। বইযুক্ত মানুষ, আলোকিত হয়, পুলকিত হয়। বই মানুষকে সুগঠিত করে। সংগঠিত মানুষের কারখানা বই। সৃষ্টিশীলতার মকতব বই। আবার পৃথিবীর সকল সমুদ্ভাসিত সমু্দ্ভাবনার ব্যাংকও বই।

এখন তো কাগজের পাশাপাশি ইলেক্ট্রনিকস বইপত্র হচ্ছে। গুগলের মলাটে বইসমগ্র গচ্ছিত। আগে কিছু কুখ্যাত দস্যুদল লাইব্রেরি পুড়িয়েছে, ছারখার করেছে। এসব দস্যুতা সভ্যতার অপূরণীয় ক্ষতি করেছে। মানুষ হত্যার মতো বই হত্যা নৃশংসতা। বই পৃথিবীর বিশদ জীবনী। বই সকল জীবনীর রক্তাপ্লুত জীবন।

বইমেলা হল, বইয়ের সম্মেলন। লাইব্রেরি তো পণ্ডিত ও ভাবুকের প্রণয় পল্লী। বইমেলা হল অবারিত প্রজ্ঞার মুঞ্জরিত সঞ্জাতমঞ্জরি। বইমেলা হল আবেগ ও বিবেকের সন্দল সংলাপ।

আমাদের বাংলাদেশে বইমেলা হয়। এবারও হচ্ছে। পৃথিবীর দেশেবিদেশে বইমেলা হয়। সবচেয়ে বড় মেলা হয় জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে। আয়তন ও বিক্রিতে এটা পৃথিবীর সেরা বইমেলা। বুক এক্সপো হয় যুক্তরাষ্ট্রে। কায়রোতে বিশাল বইমেলা হয়। ব্রিটেন, নিউদিল্লিত, হংকং, টোকিও, কলকাতায় সব জায়গায় বই মেলার আয়োজন করা হয়।

আমাদের বইমেলা সবার থেকে আলাদা। আমাদের ভাষার ইতিহাস ঐতিহ্য আলাদা। আমরা রক্ত দিয়ে ধুয়ে ভাষাকে পবিত্র ও রক্তাক্ত ও বিশুদ্ধ ও ঝলমলান করেছি। এ গৌরবগাঁথা আর কারো নেই। এজন্য, আমাদের বইমেলা প্রাণজ মেলা।

বইমেলায় সবার যাওয়া উচিত। আনপড় ও অক্ষরজ্ঞানহীন হলেও যাওয়া যায়। বইয়ের প্রচ্ছদ দেখার জিনিশ। বই ছুঁয়ে দেখার জিনিস। অক্ষরজ্ঞান থাকলে, বইমেলা ঘোরাঘুরি ও ছুটাছুটির বিষয়। বইমেলায় একুশের রক্ত জ্বলজ্বল করছে, বায়ান্নের অনুরাগ ও ত্যাগ বইমেলায় স্টলে স্টলে শোভা ছড়াচ্ছে। এজন্য বাঙ্গালি ও বাংলাদেশির বইমেলায় যাওয়া সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যগত কৃষ্টি মনে করি।

বই মেলায় বই দেখা, নাম পড়া, লেখক চেনা, প্রচ্ছদ বুঝা ও ফ্ল্যাপ পড়াও একপ্রকার বই অধ্যয়ন। বইমেলায় তো মেলা মেলা বই। নিজের রুচি, ঝোঁক ও জওক বুঝে বই খরিদ করা উত্তম। আমরা যা কিনি, তার মাঝে বই সর্বোত্তম বিনিয়োগ। বই আপনাকে বহুগুণ লাভসহ ফেরত দিবে। বই এমনি।

আমরা আপনজনের বই না কিনলে, তারা উৎসাহ ও আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। পরিচিত কেউ বই লিখলে, তার অটোগ্রাফসহ বই কিনুন। প্রশান্তি লাগবে। মুফতে বই পাওয়ার আশাকরা একপ্রকার নষ্ট লোভ। মুফতে চিন্তা বাদ দিয়ে কড়কড়ে নোটে বই কিনুন। কোন বই অর্থহীন নয়। কোন বার্তা তাতে আছেই আছে।

বই পড়ে কেউ ঠকে না। মৌলিক বই কিনতে পারলে, একটু আনন্দ বেশি। বোদ্ধা ও সমঝদার নিয়ে বইমেলায় যান। বাছাই ও যাচাই বই সংগ্রহ করুন। বই উপহার দিন।

আপনজনকে বই দিতে পারেন। শত্রুকেও বই পাঠান। বইমুখি জাতি, সুসভ্য জাতি। পত্রিকায় চোখ বুলিয়ে সেরা বই লিস্ট করুন। তারপর ঘুরেঘুরে কিনুন।

শুধু বই কিনলে হবে না, পড়তে হবে, মনোযোগ ও প্রণয়যোগ করে বই পড়তে হবে। আপনি বইপড়া অভ্যাস আয়ত্ত করতে পারলে, জীবন সুখকর হবে। বই আপনার আবহকে সুমিষ্ট রাখবে। বই আপনার চারপাশে শিউলি বিছিয়ে দিবে। আপনি রাঙা পায়ে পুষ্পল গালিচায় হাঁটবেন।

প্রতিটি জাতির রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি। সংস্কৃতি হচ্ছে জাতি ও সমাজের আয়না। এ আয়নায় হুবহু অবলোকন করা যায় কোনো নির্দিষ্ট সংস্কৃতির অনুসারীদের জীবনচিত্র, জীবনবোধের নমুনা। সংস্কৃতি জানিয়ে দেয় তার অনুসারীরা কতটুকু সভ্য , ভদ্র ও সলজ্জ। সভ্য জাতির জীবনযাত্রা নির্বাহের পদ্ধতি ফুটে উঠে তাদের সংস্কৃতিতে। শিল্প , বিজ্ঞান , দর্শন , ধর্ম ও বিবিধ বিদ্যায় একটি জাতি কতটুকু উন্নতি সাধন করেছে ,তাও দেখা যায় সংস্কৃতির আয়নায়।

বাংলাদেশের সংস্কৃতির একটি উল্লেখযোগ্য অনুষঙ্গ হচ্ছে বই মেলা। আমাদের বাংলাদেশে বর্তমানে দুই ধরনের বই মেলার আয়োজন করা হয় ।
(১) অমর একুশে বইমেলা। বইমেলা এদেশের একটি ঐতিহ্য। ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় এক সময় বাংলা একাডেমীর চত্বরে শুরু হওয়া বইমেলা বইপ্রেমীদের উপচেপড়া ভিড়ের কারণে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্থানান্তরির করা হয়। আধুনিক এ ডিজিটাল যুগেও ছাপানো বইয়ের এতটুকু গুরুত্ব কমেনি।

(২) ইসলামী বইমেলা। যা শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় , বাতিল প্রতিরোধে, অপ্রতিরোদ্ধ প্রাচীর বিনির্মাণে, পথ হারা উম্মাহর সঠিক পথ প্রদর্শন এবং একঝাক যোগ্য কলম সৈনিক গড়ে তোলা ও তাদের হাতে বই পৌছিয়ে দেওয়ার জন্য বিভিন্ন লাইব্রেরীর পক্ষ থেকে আয়োজন করা হয়।

ইসলামী বই মেলা ২০২১

পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী সা: উপলক্ষে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের দক্ষিণ প্রাঙ্গণে প্রতি বছর আয়োজন করা হয় ইসলামী বই মেলা। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও ১৯ অক্টোবর থেকে পক্ষকালব্যাপী ইসলামী বইমেলা চলছে। ৩২টি প্রতিষ্ঠানের দেয়া ৬৩টি স্টলে প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত কেনাবেচা চলে। ১৫ দিনব্যাপী ইসলামী বই মেলা ৩ নভেম্বর পর্যন্ত থাকার কথা । কিন্তু এর আগেই মেলায় স্টল দেয়া প্রকাশকরা আরো ১৫ দিন মেলা বাড়ানোর জন্য ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেন। ইফার কর্মকর্তারা তাতে সাড়া দিয়ে আরো ১০ দিন মেলা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। এ জন্য ঈদে মিলাদুন্নবী সা: উপলক্ষে ইফা আয়োজিত ১৫ দিনব্যাপী অন্যান্য অনুষ্ঠান শেষ হলেও বইমেলা ১২ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর ঘোষণা দেয়া হয়।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রকাশনা বিভাগের পরিচালক ড. আব্দুস সালাম বলেন, ক্রেতা, বিক্রেতা ও প্রকাশকদের ব্যাপক চাহিদার কারণে ইসলামী বইমেলার সময় বাড়ানো হয়েছে।

ইসলামিক ফাউন্ডেশন আয়োজিত ইসলামী এ বই মেলায় এবার ব্যাপকভাবে জমে উঠেতে দেখা যায়। বেচা-বিক্রিতেও সন্তুষ্ট স্টল মালিকরা। মেলায় রয়েছে তরুণদের সরব উপস্থিতি। মেলার প্রথম কিছুদিন উপস্থিতি কিছুটা কম হলেও পরে তা জমজমাট হয়ে ওঠে। ক্রেতাদের আগ্রহ দেখে বাড়ানো হয় সময়। বর্ধিত সময়ে এসে বিক্রিও খুব বাড়ে।

মেলায় দেখা যায় মানুষের ভিড়। কেউ বই পড়ছেন, কেউ আগে থেকেই বই পছন্দ করে এসেছেন, নির্দিষ্ট দোকানে গিয়ে পছন্দের বই কিনছেন। কেউ আবার ঘুরে ঘুরে বই দেখছেন।

মেলা কেমন লাগছে এক শিক্ষার্থীর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এত সুন্দর একটা আয়োজন, অথচ তেমন প্রচার প্রচারণা নেই। মিডিয়াতেও তেমন প্রচার নেই। প্রচার হলে মেলা আরও বেশি জমে উঠতো বলে মন্তব্য করেন তিনি।

আরেক স্নাতক শিক্ষার্থী একটি স্টলে দাঁড়িয়ে উল্টেপাল্টে বই দেখছিলেন। তিনি বলেন, এমনিতে ধর্মীয় বই তেমন একটা পড়া হয় না। ইউটিউবে কিছু বক্তার ওয়াজ দেখি। শুধু কোরআন ও হাদিস ছাড়া ঘরে তেমন ধর্মীয় বই নেই। ঘুরে ঘুরে দেখছি, ভালো লাগলে কয়েকটা বই কিনবো। কী ধরনের বই পছন্দ জানতে চাইলে তিনি বলেন, নবী রাসুলদের জীবনী ও সাহাবিদের অনেক ঘটনা ওয়াজে ও মুরব্বিদের মুখে শুনি। এরকম কয়েকটা বই কিনবো ইচ্ছা আছে।

এবারের মেলায় বই বিক্রিতেও সন্তুষ্ট স্টল মালিকরা। মেলায় ১নং থেকে ৪নং স্টল বরাদ্দ হয়েছে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নামেই। ইসলমিক ফাউন্ডেশনের বই বিক্রয় কেন্দ্র ও তথ্যকেন্দ্রের এক কর্মচারী বলেন, এবারের বেঁচাকেনা সন্তোষজনক। প্রতিদিনই ক্রেতাদের ভিড় থাকছে।

আরেক স্টলের কর্মচারী বলেন, অন্যান্য বারের তুলনায় এবার বেচাকেনা ভালো। স্টলে পর্যাপ্ত বইও রয়েছে। ক্রেতাদেরও ভিড় থাকছে নিয়মিত। যদিও প্রচার নাই। মিডিয়া নাই। তবুও যতটুকু আসছে এতেই কম না।
আরেকজন কর্মচারী বলেন, স্টলে যথেষ্ট বই উঠিয়েছেন তারা। ক্রেতাদেরও ভিড় রয়েছে। তবে শুক্রবার তুলনামূলক বেশি ক্রেতা থাকেন বলে জানান তিনি। কারণ জানতে চাইলে বলেন, জুমার দিনে সবাই আসেন। তাছাড়া শুক্রবার অনেক লেখক, বক্তা, ইসলামিক শিল্পী, ক্বারি ও বড় আলেমরা আসেন এজন্য মানুষেরও ভিড় থাকে।

মেলা কমিটি পক্ষ থেকে জানানো হয়, এবারের মেলায় ৬৩টি স্টল স্থান পেয়েছে। প্রাথমিক আবেদন পড়েছিল ৮০টির বেশি। জায়গা স্বল্পতার কারণে স্টল মালিকদের উপস্থিতিতেই লটারির মাধ্যমেই বাছাই করা হয়। লটারি বিজয়ী ৬৩টি প্রকাশনীকে স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়।

মেলা বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য সচিব ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সহকারী পরিচালক মো. শাহরুল হুদা বলেন, আমাদের এমনিতেও জায়গা কম। তেমন কোনো প্রচার প্রচরণাও নেই। নামাজের পর বায়তুল মোকাররমে ঘোষণা দেওয়া হয়। গণমাধ্যমে কিছু প্রচার হয়। এতটুকুর মধ্য থেকে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি। আগমীতে বড় করে করার পরিকল্পনা আছে, তবে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের জায়গারও স্বল্পতা রয়েছে।

বেঁচাকেনা সম্পর্কে তিনি জানান, অন্যান্য বারের তুলনায় এবারের মেলায় অনেক বেশি বিক্রি হচ্ছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন এই আয়োজনে নিজেকে সফল মনে করছে। স্টল মালিকরাও সন্তুষ্ট আছে। মেলায় ক্রেতাদের ভিড় দেখে আমরা আরও নয় দিন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

স্টলগুলোতে রয়েছে পবিত্র কোরআন ও হাদিসের বিভিন্ন গ্রন্থ। বিভিন্ন ইসলামী শিক্ষামূলক বই, মেলার স্টলে স্টলে মহানবী হযরত মুহম্মদ (সা.) সহ অন্যান্য নবী-রাসূলদের জীবনী, ইসলামী ব্যক্তিত্বদের জীবনীসহ বিভিন্ন ধরনের বই। এছাড়া মেলায় স্থান পেয়েছে জাতীয়-আন্তার্জাতিক ইসলামী ব্যক্তিত্বসহ নানান বিষয়ে গবেষণামূলক বই।

ইসলামী বইয়ের এই সমাহারে আরো রয়েছে বিভিন্ন খ্যাতনামা লেখকের বই। এছাড়া ইসলামের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি বিষয়ে আছে নানান বই।

আল-কুরআন শরীফ ( অর্থসহ) , হাদিস শরিফ ( বুখারী শরীফ) , রাসুল সা: এর সীরাত গ্রন্থ, ইসলামের ইতিহাস, মহানবীর দৈনন্দিন জীবন, নমুসলিমদের স্বাক্ষাৎকার, সাহাবীদের জীবনী, পছন্দ-অপছন্দ, জান্নাত-জাহান্নাম নিয়ে বইও রয়েছে অসংখ্য । মেলায় পবিত্র কুরআনের অনুবাদ, তাফসির, হাদিসগ্রন্থসহ ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ের ওপর মৌলিক ও গবেষণামূলক গ্রন্থ স্থান পেয়েছে। বই ছাড়াও মেলার বিভিন্ন স্টলে টুপি, জায়নামাজ, আতর, মেসওয়াক ও তজবি বিক্রি করা হয়।

প্রচার-প্রচারণায় অনিহা ও প্রতিবন্ধকতা

তবে এতকিছুর পরেও ইসলামী বই মেলায় রয়েছে অনেক প্রতিবন্দকতা। কোনো কোনো ক্রেতা অভিযোগ করেন, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগের অভাবে এ মহতি আয়োজন জমছে না। কারণ এ মেলা আয়োজন করা হলেও প্রচারণার অভাবে আশানুরূপ ক্রেতা সমাগম হয় না। এ ছাড়া মেলার প্রচার-প্রচারণার জন্য ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে কোনো বাজেট নেই বলেও জানান তারা।

মেলার আগে ও শুরু থেকে তেমন কোনো প্রচার-প্রচারণা নেই। কিন্তু বাংলাদেশে প্রত্যেকটি মেলার আগেই বিভিন্নভাবে প্রচারণার কাজ করে কর্তৃপক্ষ। এই নিয়ে ব্যবসায়ীরা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করলেও তেমন কোনো লাভ হয় না। ব্যবসায়ীদের অভিমত সঠিক প্রচার-প্রচারণা হলে মেলা আরো জমজমাট হতো।

মেলা প্রাঙ্গণে মূলধারার কোনো গণমাধ্যমের উপস্থিতি তেমন দেখা যায় না। অথচ ২১শে বই মেলা ঘিরে যেভাবে অনেক আগ থেকে প্রচার করে এবং প্রায় প্রতিদিনই এই মেলাকে কেন্দ্র করে একাধিক নিউজ থাকে তার কিয়দংশও করা হয় না ইসলামী বই মেলাকে ঘিরে।

মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে অমর একুশে বইমেলায় ইসলামি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানসমূহ বরাবরই অবহেলিত হয়ে থাকে।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে সত্য ইসলামিক ফাউন্ডেশন আয়োজন করেই দায়সারা। রাষ্ট্রীয় প্রচার মাধ্যমে এই মেলা সম্পর্কে প্রচারণার কোনো উদ্যোগ নেই। ঢাকা শহরের ইসলামি সাহিত্যপ্রেমীরাও এই বইমেলা সম্পর্কে জানতে পারেন না। দেশের মিডিয়াগুলোতে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এই মেলা নিয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কোনো প্রচার প্রচারণার উদ্যোগ নেই।

মেলায় অংশগ্রহণকারী ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন মেলা উপলক্ষে স্টল বরাদ্দের জন্য শুধুমাত্র লটারী দিয়েই দায়সারা। একটিই মাত্র কারণ ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগের অভাবে এ মহতী আয়োজন জমছে না বলে জানিয়েছে ব্যবসায়ীরা। তারা বলেছেন, প্রচার-প্রচারণাবিহীনভাবে যদি মেলা চলতে থাকে তাহলে মেলায় আশা অনুরূপ ক্রেতা থাকবে না। এ কারণে আগামীতে বই মালিকদের একটি অংশ মেলায় অংশগ্রহণ নিয়ে শঙ্কা বলেও জানা গেছে।

এক মেলায় আগত এক ক্রেতা বলেন, বায়তুল মোকাররমে নামাজ পড়তে এসে দেখলাম এখানে ইসলামি বইমেলা চলছে। যদি এখানে নামাজে না আসতাম, তাহলে জানতেই পারতাম না এখানে সুন্দর একটি মেলা বসেছে। এই ধরনের আয়োজন মুসলমানদের জানানো ফাউন্ডেশনের দায়িত্ব বলেও তিনি মনে করেন।

বাংলা একাডেমির বইমেলায় ইসলামি প্রকাশনীগুলো উল্লেখযোগ্য স্টল বরাদ্দ পায় না। এটা অঘোষিত নিয়ম, আর দৃশ্যমান ঐতিহ্য।

আজ কোন এক অজানা কারণে দেশের কোন বড় মিডিয়া সঠিক ভূমিকা পালন করছে না ইসলামী বইমেলার প্রচার-প্রসারে।

কোনো এক ২১ শে বইমেলায় পরিবারসহ ঘুরতে আসা এক ক্রেতা দুঃখভরা কণ্ঠে বলেন ‘বইমেলায় তো সব রকমের বইয়ের স্টলই দেখলাম। কিন্তু অভিজাত ইসলামী প্রকাশনীগুলোর তেমন স্টল দেখলাম না। ছেলেমেয়েদের পছন্দের বই কিনে দিয়েছি। কিন্তু আমার পছন্দ করার মতো কোনো ইসলামী বই খুঁজে পেলাম না’। এমন অভিযোগ শুধু মালেকা বেগমেরই নয়। তার মতো হাজারো দর্শনার্থীর।

বইমেলায় ঘুরতে আসা দর্শনার্থীদের মধ্যে বাচ্চা ও তরুণদের ঝোঁক গল্প ফিকশনের দিকে থাকলেও বয়স্কদের ঝোঁক থাকে প্রবন্ধ, ভারী উপন্যাস এবং ইসলামী বইয়ের দিকে। প্রবন্ধ ও উপন্যাসের বই পাওয়া যায়। কিন্তু ইসলামী বইয়ের খোঁজ করলে তাদের হতাশ হতে হয়। বিশেষ করে নারীদের। তারা নানা কারণে একা একা ইসলামী লাইব্রেরিগুলোয় যেতে সংকোচ বোধ করেন। কিন্তু বইমেলায় সেই সংকোচ থাকে না।

পরিবারের সঙ্গে ঘুরতে এসে নির্দ্বিধায় নিজেদের পছন্দের বই কিনতে পারে। আরেক দর্শনার্থী জানিয়েছিলেন ‘ইসলামী বই সম্পর্কে তেমন ধারণা না থাকার কারণে সরাসরি লাইব্রেরি থেকে নিতে পারি না। বইমেলায় এসে হাজারো বইয়ের মধ্যে পছন্দ করে বই কেনার আশায় থাকি। কিন্তু এখানে এসে আমাদের সেই ইচ্ছা পূরণ হয় না।

’ সত্যিই তাই। বইমেলায় প্রায় ৬০০-৭00 স্টল থাকে। কিন্তু এর মধ্যে ইসলামী প্রকাশনীর তেমন কোনো স্টল নেই। বছরের অন্যান্য সময় ইসলামী প্রকাশনীগুলোর উদ্যোগে কিতাবমেলা অনুষ্ঠিত হলেও সেটা তেমন জমজমাট হয় না এবং অধিকাংশ মানুষ তার খবর জানে না। অন্যদিকে একুশে বইমেলা বাঙালিদের প্রাণের মেলা। এখানে দলমত নির্বিশেষে সবার আগমন ঘটে। শহরজুড়ে একটা উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। সবাই নিজেদের পছন্দের বই কেনার জন্য মেলায় ভিড় জমাতে থাকে।

সুতরাং সেখানে গল্প-উপন্যাসের যেমন প্রয়োজন আছে, তেমনই ইসলামী বইমেলারও প্রয়োজন আছে। বিশেষ করে সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব অপরিসীম।
তাই মহান একুশে বইমেলায় গল্প উপন্যাসের পাশাপাশি ইসলামী বাইয়ের স্টল রাখা এখন সময়ের দাবি। অভিজাত লাইব্রেরির স্বত্বাধীকারীরা এদিকে খেয়াল করলে অবশ্যই তা সম্ভব হবে।

নানামুখী প্রতিবন্ধকতা মাড়িয়েই ইসলামী সাহিত্য দুনিয়া এগিয়ে চলছে। বাংলাদেশে ইসলামি সাহিত্যের দিনদিন কদর বাড়ছে। অনেক ইসলামী বই আছে যা এখন জনপ্রিয়তার শীর্ষে। এই বইগুলো পড়তে তরুণদের আগ্রহ বাড়ছে ব্যাপকহারে। এই বইগুলো প্রকাশের পর থেকে নতুন করে তরুণদের ইসলামি বই পড়তে আগ্রহী করে তুলছে।

বর্তমানে ইসলামিক চিন্তাধারার বই কেনা ও পড়ার মতো পাঠকের সংখ্যা বাড়ছে তাই মেলায় ক্রেতাদের উপস্থিতিও বাড়ছে। অনেকে তাদের ছেলে মেয়েদের জন্য ভালো ভালো ইসলামী বই খুঁজতে মেলায় আসেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন মাধ্যমে চলছে এর প্রচার ও প্রসার। ইসলামী বই মেলায় অংশগ্রহণ ও বই কিনতে ফেসবুকে স্ট্যাটাসসহ বিভিন্ন মাধ্যমে দেশের তরুণ সমাজকে আহ্বান জানান অনেক ইসলামী ব্যক্তিবর্গ।

এদিকে মেলায় প্রতিদিনই আসা যাওয়া চলছে বিভিন্ন ইসলামী ব্যক্তিত্বের। এছাড়া মেলা প্রাঙ্গণ মুখরিত হচ্ছে ইসলামী সংগীত শিল্পীদের পদচারনায়ও।

বইমেলা প্রতিটি জাতির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সুযোগ থাকলে এই মেলার ক্যাম্পেইন করতে হবে। কোন পত্রিকা কিংবা টেলিভিশনে প্রচার না করলেও, সোশ্যাল মিডিয়া ও ব্যক্তিগতভাবে যতটুকু সম্ভব প্রচার প্রচারণা চালাতে হবে। বই না কিনলেও অন্ততপক্ষে বইমেলায় এসে ঘুরে যেতে হবে । ভালো মানের ও ইসলামী বইয়ের গুরুত্ব দিন দিন বেড়েই চলছে। তাই ইসলামের আলো ছড়িয়ে দেয়া, মানুষকে তার সভ্য ও পরিচ্ছন্ন জীবন গঠনে ইসলামী এ বই মেলা, আদর্শের এ বই মেলার প্রয়োজনীয় ও নান্দনিকতা ছড়িয়ে দিতে হবে জনে জনে।