ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:
ব্রেকিং নিউজ

সালাহ উদ্দিন কাদের

৪ নভেম্বর ২০২১, ১৬:১১

বিআইডব্লিউটিএ ও হিসাব-নিকাশে উন্নয়নের রোল মডেল

21833_541121.jpg
প্রতীকি ছবি
জাতি হিসেবে আমরা নিজেদের উন্নয়ন নিয়ে প্রচারণায় বেশ অগ্রসর। বিশ্বদরবারে কিংবা দেশীয়ভাবে কিছু পেতে  উন্নয়ন করতে আমরা বেশ পটু তা তুলে ধরতেই হবে। দেশের নানাদিক উন্নয়নের সূচকে এগিয়েছে বলে আমরা বেশ প্রচারণায় মেতে আছি ‘ আমরা উন্নয়নের রোল মডেল’। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমরা প্রতিবেশী দেশকেও ছাড়িয়ে গেছি। উন্নয়নের সূচক তুলে ধরতে দেশের অর্থনীতি, সামাজিক ব্যবস্থা, শিক্ষা, চিকিৎসা, রাজনীতি, সরকারের বিভিন্ন বিভাগের সক্ষমতা ও দক্ষতা, আইন ও বিচার ব্যবস্থা সহ বেসরকারি খাতের সম্প্রসারন ও বিকাশ, বেকারত্ব হ্রাস ইত্যাদি সামনে রাখতে হয়। সেই বিবেচনায় বাংলাদেশের এসব বিভাগ ও খাত কতটুকু এগিয়েছে তা সাম্প্রতিক নৌদুর্ঘটনা সামনে আনলে তা সহজেই বোধগম্য হবে।

বিশ্ব বাণিজ্য ও দেশীয় বাণিজ্য পরিচালনার জন্য নৌপথ অন্যতম মাধ্যম। স্বল্প খরচে পণ্য পরিবহনের জন্য এর বিকল্প এখনো গড়ে উঠেনি। কিন্ত এই মাধ্যম ব্যবহার করে অনেক বড় ব্যবসায়ীকে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে আর্থিকভাবে নিঃস্ব হওয়া সহ প্রাণহানির মুখোমুখি হতে হয়েছে।  চলতি বছরের ২৭ অক্টোবর বুধবার সকালে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া থেকে ছেড়ে আসা মানিকগঞ্জের পাটুরিয়ার ৫ নম্বর ঘাটে পদ্মা নদীতে ১৭টি যানবাহন নিয়ে ডুবে যায় রো রো আমানত শাহ ফেরি।  ফেরিটি সকালে পাটুরিয়ার ৫ নম্বর ঘাটের কাছাকাছি পৌঁছালে কাত হয়ে যায়। এসময় ফেরিটিতে থাকা পণ্যবাহী ট্রাকসহ ১৭টি যানবাহন নদীতে পড়ে যায়।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ২ নভেম্বর পর্যন্ত একটি মোটরসাইকেল ব্যতীত সবকটি যানবাহন উদ্ধার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু আজ নয় দিন পেরিয়ে গেলেও শাহ আমানত ফেরিটি এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

 ডুবে যাওয়ার পর ফেরিটি উদ্ধারের জন্য কাজ শুরু করে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’ও ‘রস্তম’,ফায়ার সার্ভিস, কোস্টগার্ড, নৌবাহিনীসহ ৫টি রাষ্ট্রীয় সংস্থা। কিন্তু এ দু‘টি উদ্ধারকারী জাহাজের উদ্ধার সক্ষমতা না থাকায় অবশেষে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘জেনুইন’এন্টারপ্রাইজেএর সাথে বিআইডব্লিউটিএ একটি  উদ্ধার চুক্তি সম্পন্ন করে। চুক্তি অনুযায়ী নৌ-মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনক্রমে ফেরি উদ্ধারের যাবতীয় ব্যয় বহন করবে বিআইডব্লিউটিএ। এ জন্য বিআইডব্লিউটিকে গুণতে হবে প্রায় দুই কোটি টাকা।

বাংলাদেশ যদি উন্নয়নের রোল মডেল হয়ে থাকে তাহলে কেন বিআইডব্লিউটিএ’র মতো এতো বড় সরকারি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান থাকতে একটি ফেরি উদ্ধার করতে কেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি করতে হচ্ছে? এমন প্রশ্ন থেকেই যায়।

রো রো আমানত শাহ ফেরিটির লাইট ওজন ৪৮০ মেট্রিক টন। জাহাজটি ডুবে যাওয়ায় তার ওজন দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭০০ মেট্রিক টন।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) তথ্যমতে , তাদের কাছে বর্তমানে মাত্র চারটি উদ্ধারকারী জাহাজ রয়েছে। এগুলোর সম্মিলিত উত্তোলন ক্ষমতা ৬২০ মেট্রিক টন। এর মধ্যে হামজা ১৯৬৪ সালে এবং রুস্তম ১৯৮২ সালে সংস্থাটিতে সংযুক্ত করা হয়। এর প্রতিটির উত্তোলন ক্ষমতা মাত্র ৬০ মেট্রিক টন। পুরনো ও মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় এ দু’টির উত্তোলন ক্ষমতা এখন ৪০-৫০ টনের বেশি নেই। ২০১২ সালে প্রায় ৩৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্ভীক ও প্রত্যয় নামে আরো দু’টি উদ্ধারকারী জাহাজ দক্ষিণ কোরিয়া থেকে আনা হয়। এগুলোর প্রতিটির উত্তোলন ক্ষমতা সর্বোচ্চ ২৫০ মেট্রিক টন।

নদ-নদীতে দুর্ঘটনা ঘটলে যেখানে উদ্ধার তৎপরতায় আধুনিক ও শক্তিশালী জাহাজ ব্যবহার করা প্রয়োজন, সেখানে হামজা ও রুস্তমের মতো উদ্ধারকারী জাহাজ ব্যবহার করা হাস্যকরই বলা চলে।    
         
এখানে স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে বিআইডব্লিউটিএ’র যেসব উদ্ধারকারী জাহাজ রয়েছে সেগুলো  নামের ক্ষেত্রে যতটা চমকপ্রদ,  কাজের ক্ষেত্রে ততটাই দুর্বল। এসব উদ্ধারকারী জাহাজ দিয়ে বড় বড় লঞ্চ বা পণ্যবাহী  জাহাজ উদ্ধার করা সম্ভব নয় বললেই চলে।

এদিকে বর্তমান সময়ে বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলে চলাচলকারী যাত্রীবাহী লঞ্চ ও পণ্যবাহী নৌযানগুলোর বেশিরভাগের ওজন ৭০০ থেকে দেড় হাজার মেট্রিক টন। তাই এসব নৌযান দুর্ঘটনায় পড়লে বিআইডব্লিউটিএ তা উদ্ধারে সক্ষমতা নেই। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিআইডব্লিউটিসি ২০১৪ ও ২০১৫ সালে এমভি বাঙালি ও এমভি মধুমতী নামের যে দু’টি যাত্রীবাহী নৌযান নির্মাণ করেছে, নকশা অনুযায়ী এর প্রতিটির ওজন ১ হাজার মেট্রিক টন। বেসরকারি খাতে ঢাকা-বরিশাল ও দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন পথে চলাচলকারী বিলাসবহুল যাত্রীবাহী লঞ্চগুলোর ওজন ৭০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন পর্যন্ত।

বিআইডব্লিউটিএ’র সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, গত ১১ বছরে নৌ-দুর্ঘটনায় ৩৮৭টি নৌযান ডুবে গিয়েছে।  উদ্ধারকারী জাহাজের অভাবে এগুলোর মধ্যে ১৮১টি নৌযান উদ্ধার করতে সক্ষম হয়নি সংস্থাটি।

আমাদের দেশে  বড় এবং ভারী নৌযানের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। ইতিমধ্যে সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর ৫০০ হইতে ২ হাজার টনের অধিক পণ্য ও যাত্রীবাহী নৌযান চলাচলের অনুমোদন দিয়েছে। সে অনুযায়ী দেশে শক্তিশালী এবং আধুনিক উদ্ধারকারী জাহাজ কেন গড়ে উঠছে না তা নিয়ে নানা মহলে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।