ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:

অনলাইন ডেস্ক

২৫ আগস্ট ২০২১, ১২:০৮

ইলমান নাফিয়ান; কল্যাণকর জ্ঞান আপনাকে অপ্রতিরোধ্য বানাবে-

20142_ALO.jpg
মধ্যযুগে সারা বিশ্বের সামনে ঐশ্বর্য ও সম্পদ, শৌর্য-বীর্য ও জ্ঞান গরীমা, শিক্ষা আর সংস্কৃতির লীলাভূমি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিল ইসলামি খেলাফত। একদিকে উমাইয়াদের নেতৃত্বে আন্দালুসিয়ার ইসলামি খেলাফত, অপরদিকে আব্বাসীয়দের নেতৃত্বে বাগদাদ। আর ওদিকে মিশরে ফাতেমি খেলাফত স্থানান্তরিত হয়েছে আইয়ুবি বংশের হাতে।

অবশ্য প্রায় প্রতিটি খেলাফতেরই ছিল অন্তর্কলহ, আভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ ও সংঘাত। বাগদাদের আব্বাসীয় খেলাফতও এরকম অবস্থায় নিপতিত হয়ে চরম দু:সময় পার করছে ক্ষমতার টানাপোড়েনের মধ্যে। এরকম সময়ে (১২৫১ খৃ:) মোঙ্গল তাতার যোদ্ধা চেঙ্গিজ খাঁন আব্বাসীয় খেলাফত অভিমূখে অভিযান চালিয়ে একের পর এক তিব্বত, পারস্য ও সিরিয়ার অধিকাংশ এলাকাই দখল করে নেয়।

মরুচারী তাতার বাহিনী বাগদাদ শহরের সৌন্দর্য, আভ্যন্তরীণ ও ভৌতিক অবকাঠামো ও নগর ব্যবস্থাপনা, উন্নত সেচ ও কৃষি ব্যবস্থা, রাস্তা-ঘাট, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, শিক্ষা ও সংস্কৃতিক পরিবেশ দেখে বিষ্ময়ে বিমূঢ় হয়ে পড়ে। তাদের চোখে কোন একটা জনপদের এতোটা উন্নতি ও আধুনিকতা, সুখ ও সমৃদ্ধি, জনজীবনের এতোটা শান্তি ও সামাজিক নিরাপত্তা অবিশ্বাস্য, অভাবনীয় ঠেকে, কারণ তারা এগুলোর সাথে এর আগে পরিচিত ছিল না।

স্বভাবজাত রুঢ়তা ও নৃশংসতা নিয়ে তারা অন্যান্য জায়গার মতো বাগদাদবাসীর উপরেও নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালায়। মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই কয়েক লক্ষ অধিবাসীকে হত্যা করে এবং পুরো এলাকাকে একরকম মৃত্যুপূরী বানিয়ে ছাড়ে। বাগদাদের অধিবাসীদের হত্যা করেই কেবল ক্ষান্ত হয়নি, সকল ধরনের অবকাঠামোও তারা ধ্বংস করে দেয়। এ যেন কেয়ামতের ধ্বংসযজ্ঞ নেমে আসে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ শহর ও তার অধিবাসীদের উপরে।

বাড়ি থেকে বাড়িতে, পাড়া থেকে পাড়ায়, গলি থেকে গলিতে তাতাররা ধ্বংসযজ্ঞ ও লুটতরাজ পরিচালনার সময় বিষ্মিত হয়ে লক্ষ্য করে প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই সমৃদ্ধ পাঠাগার, বইয়ের স্তুপ। ধনী গরিব, সাধারণ প্রজা কিংবা ক্ষমতাশালী সবাই এ ক্ষেত্রে সমান। খোদ সুলতান ও তার সভাসদ, প্রশাসনের হর্তাকর্তা সবাই এ ক্ষেত্রে একই রকম। সবার বাড়িতেই বইয়ের সমাহার, ব্যক্তিগত লাইব্রেরির অস্তিত্ব বিদ্যমান।

তাতাররা অবাক! এতো বই কেন? তাও আবার প্রত্যেক বাড়িতে! শুধু বাড়িতেই নয়, প্রতিটি পাড়ায় পাড়ায় সরকারি পাবলিক লাইব্রেরিতে অসংখ্য বই থরে থরে সাঁজানো!! বিষ্মিত হালাকু খাঁন বিষ্ময়ভরা কন্ঠে জানতে চান, এসবের রহস্য কি? বাড়ি বাড়ি বই কেন? এতো বই কি করে এরা?

হালাকু খাঁনের পরামর্শকরা তাকে জানালেন; ‘মহামান্য সম্রাট, আমরা যে বাগদাদের বিষ্ময়কর উন্নতি, অগ্রগতি, সমৃদ্ধি, ঐশ্বর্যমন্ডিত সমাজ দেখছি, বিশ্বজুড়ে তাদের যে প্রভাব, প্রতিপত্তি শক্তি ও ক্ষমতা দেখছি, তার পেছনে মূল শক্তি, মূল কার্যকারণ হলো এই বইগুলো, এই বইগুলোতে লুকিয়ে থাকা জ্ঞান।’

বিষ্মিত হালাকু খাঁনের কপাল কুঁচকে উঠলো। তিনি তা হলে বাগদাদবাসী, তথা, মুসলমানদের ক্ষমতা ও শক্তির মূল কার্যকারণ, মূল উৎসের খোঁজ পেয়েছেন! এ জাতির শক্তি আর ক্ষমতার মূল চাবিকাঠীর সন্ধান! মুসলমানরা যেন আর জীবনেও ঘুরে দাঁড়াতে না পারে সে জন্য নির্দেশ দিলেন মুসলমানদের ক্ষমতা, শৌর্য-বীর্য আর উন্নতির আসল রহস্য এইসব বইকে পুড়িয়ে ফেলার।

খাঁন-ই খাঁনানের নির্দেশ পেয়ে সৈন্যরা তার হুকুম তামিলে নেমে পড়লো। শুরু হলো এক কলঙ্কজনক বহ্নোৎসব! পুরো বাগদাদ নগরীর আনাচে কানাচে স্তুপের পর স্তুপ বই জমা করে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়া হলে কালো ধোঁয়ায় ছেয়ে গেল বাগদাদের আকাশ! অচিরেই দেখা দিল এক বিপদ; মহাবিপদ। শহর, গ্রামের অলিতে গলিতে এতো বেশি বই পুড়তে লাগলো যে, সারা শহর কালো ধোঁয়ায় ভরে গেল। তাতার সৈন্যরা নিজেদের চোখ, নাক, মুখে জ্বালা অনুভব করতে শুরু করলো। এমনকি, এক সময় নি:শ্বাস নেয়াটাই কষ্টকর হয়ে পড়লো। অবস্থা বেগতিক দেখে নতুন নির্দেশনা এলো; পোড়ানোর দরকার নেই, বইগুলোকে ফোরাত নদীর মধ্যে নিক্ষেপ করা হোক।

নতুন নির্দেশের ভিত্তিতে অবশিষ্ঠ বইগুলোকে ফোরাতে নিক্ষেপ করায় অবস্থা এমন হলো যে, বইয়ের পার্চমেন্ট ও কাগজের পাতা পচে গলে মন্ডে পরিণত হলে পুরো ফোরাতের পানি ভীষণ দূর্গন্ধযুক্ত কালো রং ধারণ করলো। এ যেন আমাদের দেশে বর্ষাকালের খালে-বিলে, ডোবা কিংবা পুকুরে কৃষক কর্তৃক পাট ভিজিয়ে রাখার ফলে পচে যাওয়া পানি! সেই পানি পান করার যোগ্য রইলো না! এর পরে দীর্ঘ কয়েক মাস, বলা চলে, বছরখানেক সময়কাল বাগদাদবাসী ফোরাতের পনি পান করতে পারেনি!

এতো কিছু করেও কিন্তু হালাকু খাঁন ও তাতার গোত্র ইসলামকে নির্মূল করতে পারেনি। বাগদাদে মুসলমানদের উত্থানকেও ঠেকাতে পারেনি। বরং পরবর্তী মাত্র চারটি দশকের মধ্যে নিজেরাই ইসলাম গ্রহণ করে মুসলমান হয়ে যায়, হয়ে যায় ইসলামের নিষ্ঠাবান অনুসারী, রক্ষক এবং প্রচারকও!

বস্তুত বই, বইয়ের জ্ঞান যদি সকল জ্ঞানের ধারক; আল কুরআনের জ্ঞানের সাথে সামঞ্জশ্যশীল হয় তবে সেই বই একজন ব্যক্তি বা একটি জাতিকে অজেয়, পরাক্রমশালী হিসেবে গড়ে তুলবেই। ইতিহাসই তার স্বাক্ষী। এ কারণেই যুগে যুগে স্বৈরাচার, জালিম শাসক থেকে শুরু করে শত্রুপক্ষ সব সময়ই আল কুরআনের বিরুদ্ধে, ইসলামি সাহিত্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।

আপনি নিজের ব্যক্তিসত্তা, নিজের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, দেশ ও জাতিকে যদি অজেয় হিসেবে গড়ে তুলতে চান, বিশ্বের বুকে অপ্রতিদ্বন্দী হিসেবে দেখতে চান, তবে আশ্রয় নিতে পারেন বইয়ের পাতায়। এমন বই, যে বই বিশ্ব মানবতার কল্যাণের কথা বলে, সত্য ও সুন্দরের কথা বলে। আল কুরআনের জ্ঞান ও দর্শনকে বোধগম্যভাবে তুলে ধরে।

জিয়াউল হক
লেখক ও কলামিস্ট