ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:

রফিকুজজামান রুমান

২২ আগস্ট ২০২১, ১৬:০৮

পর্দাহীন একটি সপ্তাহ!

20067_0.jpg
সংগৃহীত ছবি
হাওরে ঘুরতে গেলাম সম্প্রতি। সারাদিনের অনিন্দ্য সৌন্দর্য গায়ে মেখে, মনে ধারণ করে মিঠামইন হাওরের বুক চিড়ে যখন ফিরছি ঢাকায় ফিরবো বলে, আকাশের লাল-শুভ্র মেঘের ভাজে ভাজে তখন মহররমের দশমী চাঁদের কী দ্যুতিময় উপস্থিতি! এমনিতেই সন্ধ্যার একটি আলাদা সৌন্দর্য রয়েছে। হাওরের বুকে সে যেন অপরাজেয় সুন্দরের জয়গান গেয়ে ওঠে। আর সেই সন্ধ্যা, সেই হাওর যদি ভেসে যায় চাঁদের রূপালি প্লাবনে, তার সৌন্দর্য বলে কয়ে বোঝানোর জিনিস না!

না, এটি ভ্রমণকাহিনী নয়। বলছিলাম, এমন সুন্দর স্বর্ণালি সন্ধ্যায়ও আমরা যে জনাবিশেক ছিলাম হাওরের নৌকায়, দেখলাম সবার হাতেই স্মার্টফোন, সবার চোখেই স্মার্টফোনের স্ক্রিন! আহারে, এতবড় আকাশকে মাথার উপরে রেখে, এতছোট পর্দায় (স্ক্রিনে) আমরা কী খুঁজি! চাঁদের স্নিগ্ধ রূপালি রং ছেড়ে মোবাইলের কোন রং এ নিজেদেরকে রাঙ্গাতে চাই? আকাশের দিকে তাকালে আকাশ তো মাথা উঁচু করতে শেখায়। মোবাইলের পর্দা শেখায় মাথা নত করতে। আমরা কি ইতিমধ্যেই একটি মাথা-নত জাতিতে পরিণত হয়েছি? আমরা কি আকাশ দেখি? বিশেষ করে আমাদের উত্তর-প্রজন্মের কী খবর? এমন ঘর কয়টি পাওয়া যাবে, যেখানে বাচ্চাদের হাতে স্মার্টফোন নেই। এমন বাচ্চা কোথায় আছে, টেলিভিশন না দেখে ভাত বা অন্যকিছু খেতে রাজি হয়ে যায়।

এ কেমন অধঃপতন!

টেলিভিশন, কম্পিউটার, মোবাইলফোন- এর বাইরে বাচ্চাদের আর জগৎ কই! আমরা তবু হাওরে যাই, আমাদের বাচ্চাগুলো তো যায় হারিয়ে। হারিয়ে যায় পাবজি, ফ্রি-ফায়ার, আর মটু-পাতলুর সীমাহীন রাজ্যে।

বাচ্চারা তাই শৈশব হারায়, বন্ধুত্ব হারায়, সামাজিক যোগাযোগ হারায়। এই হারিয়ে যাওয়ায় আরও মাত্রা যোগ করেছে চলমান করোনা পরিস্থিতি এবং তার কারণে বন্ধ হয়ে থাকা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম একটি সাময়িক সমাধান হতে পারে, কিন্তু কোনোভাবেই বাচ্চাদের জন্য এটি স্বস্তির বিষয় নয়। আর এক মুহূর্তও বাচ্চাদের অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করার যুক্তি থাকতে পারে না। অনলাইন বিশেষ করে বাচ্চাদের যে ‘লাইনচ্যুত’ করে দিচ্ছে, সেটি বুঝতে যত বিলম্ব হবে, বাচ্চাদের সর্বনাশ তত বেশি হবে। মনে রাখা ভালো, শুধুমাত্র পড়াশুনা আর পরীক্ষা নেওয়ার নামই স্কুলিং নয়। স্কুল একটি সামগ্রিক ধারণার বিষয়। আচরণ, পারস্পারিক যোগাযোগ, বন্ধুত্বের অনুভূতি, শৃক্সক্ষলা, খেলাধূলা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ- এমন আরো অনেক জরুরি বিষয় নিয়েই স্কুলিং এর ধারণা কার্যকর হয়। দু:খজনক হলো, অনলাইনে এসবের কিছুরই তেমন অনুশীলন হয় না, হওয়ার সুযোগ থাকে না। তাই ওদের স্কুলে যাওয়াটা জরুরি। কবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলবে, বাচ্চারা কবে স্কুলে ফিরবে এ নিয়ে সরকারের হিসেব সরকার করুক। আমার পারিবারিক আয়োজনে কিছু কাজ করে নিতে পারি।

বলে রাখা ভালো, স্ক্রিন আসক্তির এই সমস্যা শুধু বাচ্চাদের নয়; বড়দেরও। শুধু বাংলাদেশের নয়; কমবেশি সারাবিশ্বেরও। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের খবরই যদি দেখা যায়, সেখানে একটি স্কুলগামী শিশু সারাবছরে গড়ে এক হাজার ঘণ্টা সময় টেলিভিশন দেখে, যা তার স্কুলে কাটানো সময়ের চেয়ে বেশি! একজন মার্কিন নাগরিক গড়ে তার জীবনের নয় বছর সময় টেলিভিশন দেখে ব্যয় করে। এর সঙ্গে অধুনা যুক্ত হয়েছে মোবাইল ফোন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। দীর্ঘসময় ধরে টেলিভিশন বা কম্পিউটার/মোবাইল দেখলে বাচ্চাদের শারীরিক ওজন অতিরিক্ত হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি ছয় শতাংশ বেড়ে যায়। সমস্যা ব্যাপক ও বহুমুখী। সে দিকে না গিয়ে উত্তরণের উপায় খোঁজা যাক।
একথা সত্য, বর্তমান পৃথিবীতে প্রযুক্তি এবং যোগাযোগের সর্বাধুনিক মাধ্যম উপেক্ষা করে চলা সহজ নয়। তাই পুপোপুরি প্রযুক্তিবিমুখ হওয়ার কথা কেউ বলছেও না। কিন্তু ব্যবহারে পরিমিতিবোধ এবং সময়-উপযোগিতা খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে দুই বছর বয়সের আগে বাচ্চার সামনে কোনো ধরনের ডিভাইস না দেওয়াটা জরুরি। একটা সময় তাকে আর আটকানো যাবে না হয়তো। সেখানেই বাবা-মাকে সতর্ক ভূমিকা পালন করতে হবে। আঠেরো বিশ বছরের আগে ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন না দেওয়াই ভালো। বাচ্চারা বিকল্প খোঁজে। এটি খুবই প্রমাণিত, শুরু থেকেই যদি বাচ্চাদেরকে বাবা-মায়েরা বেশি সময় দেয়, খেলাধূলা করে, তাহলে বাচ্চারা প্রযুক্তির প্রতি অতিরিক্ত আসক্ত হয় না। আর একটি করণীয় বেশ গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ‘টেলিভিশন বন্ধ সপ্তাহ’ (TV-Turnoff Week) নামের একটি উদযাপন আছে যেখানে বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে টানা এক সপ্তাহ বাসার টেলিভিশন বন্ধ থাকে। এটি সাধারণত এপ্রিলের ২৫ থেকে মে’র এক তারিখ পর্যন্ত পালিত হয়। এই এক সপ্তাহ বাবা-মায়েরা বাচ্চাদেরকে প্রচুর সময় দেয়, বাইরে ঘুরতে যায়, নানা অনুষ্ঠান করে। মূল কথা, এসময়ে কোনোভাবেই টেলিভিশন অন করা যাবে না। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, বাচ্চারা বলেছে, এই এক সপ্তাহই তাদের জীবনের সেরা সপ্তাহ!

সময় পাল্টেছে। এখন টেলিভিশন শুধু নয়; যুক্ত হয়েছে কম্পিউটার মোবাইল ফোনের পর্দাও। এবং সেখানেও বড়দের পাশাপাশি শিশুদের উপস্থিতি আশঙ্কাজনক। তাই এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পালন করা হয় ‘পর্দামুক্ত সপ্তাহ’ (Screen Free Week). বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে টানা এক সপ্তাহ সব ধরনের প্রযুক্তি তথা পর্দা থেকে মুক্ত থাকা। এটিকে ইংরেজিতে এভাবে বলা যেতে পারে, `turn off screens to turn on life!’ পর্দামুক্ত হয়ে জীবনের সঙ্গে যুক্ত হওয়া। স্ক্রিন বা পর্দার অব্যাহত ব্যবহার শরীর মনের ক্ষতি তো করেই; অবিশ্বাস আর উদ্বেগেরও কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পর্দার জীবন তো আসল জীবন নয়! পর্দা একটি বায়বীয় বাস্তবতা তৈরি করে। পর্দার পরীমনিদের সঙ্গে রক্তমাংসের পরীমনিদের যোজন যোজন ব্যবধান। মানসী কবিতায় রবীন্দ্রনাথ নারীকে যেমন বলেছিলেন, “অর্ধেক মানবী তুমি অর্ধেক কল্পনা।” পর্দায় যা দেখি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার শতভাগই কল্পনা!

কল্পনার জগৎ ছেড়ে বাস্তবতায় বাস করি। আসুন, হাওর দেখি। হাওরে লেপটে পড়া জোৎসনা দেখি। কাঁশফুলের শুভ্রতা দেখি। বাচ্চাদের নিয়ে গ্রামে যাই। সেখানে ওদেরকে নিয়ে হাঁস মুরগী দেখি। চালতে গাছে ঝুলে পড়া মৌমাছির চাক দেখি। দেখে নিই সৃষ্টির অপরূপ সৌন্দর্যগাঁথা। তার জন্য সবার আগে দরকার ‘পর্দামুক্ত একটি সপ্তাহ’ উদযাপন শুরু করা। প্রতিবছর সাত দিন করে, না হলে অন্তত তিন দিন করে পরিবারের সবাই মিলে সব ধরনের পর্দা (screen) থেকে দূরে থাকি। প্রাথমিকভাবে অন্তত এক দিন করে হলেও শুরু করা যায়। জাতীয়ভাবে ঘোষণা দিয়েই কাজটি করা যায়। প্রতিবছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে এটি উদযাপিত হতে থাকবে। একটা সময়ে গিয়ে হয়তো ব্যাপক সাড়া পরবে। জাতীয়ভাবে না হলে পারিবারিক উদ্যোগে তো এটি সহজেই করা যায়।

আসুন শুরু করি, পর্দাহীন একটি সপ্তাহ!

লেখক: রফিকুজজামান রুমান
বিভাগীয় প্রধান
জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ