ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
ব্রেকিং নিউজ

স্টাফ রিপোর্টার

২৯ এপ্রিল ২০২১, ১৯:০৪

করোনা ভাইরাস: মানুষের আর্তনাদ!

17069_4125.jpg
করোনাভাইরাস বর্তমান বিশ্বের এক নতুন আতঙ্কের নাম। যা বর্তমান বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্রকেও নাকানিচোবানি দিয়েছে। চীন স্পেন ইতালির মতো দেশগুলো হিমশিম খেয়েছে পরিস্থিতি সামাল দিতে। আবার পরিস্থিতির সামনে ঘুরে দাঁড়িয়েছে অনেক দেশ।
 
পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত বর্তমানে নাজেহাল করোনা পরিস্থিতির কাছে। হিমশিম খাচ্ছে পরিস্থিতি সামাল দিতে। হাসপাতালগুলোতে অক্সিজেন সংকট চরম পর্যায়ে। ব্যাহত হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম। ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে রোগীদেরকে।
 
বাংলাদেশেও করোনা ভাইরাসের প্রকোপ একদম কম নয়। দেশ এখন স্বাস্থ্য বিজ্ঞানীদের ভাষায় দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলা করছে। আক্রান্ত এবং মৃত্যুর সূচক গত কয়েকদিন যাবত ঊর্ধ্বমুখী। দৈনিক মৃত্যুর সংখ্যা শতাধিক।
 
দেশে প্রথম করোনাভাইরাস শনাক্ত হয় গত বছরের ১৭ মার্চ। এরপর সরকার আর স্বাস্থ্য বিভাগের সম্মিলিত প্রয়াসে ঘোষণা করা হয় লকডাউন। নিয়ন্ত্রণে আসে করোনার প্রথম ঢেউ। ঘুরে দাঁড়িয়েছিল গোটা দেশ।
 
তবে এখন দেশ করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের মুখে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় ঘোষণা করা হয়েছে কয়েক দফায় কঠোর বিধি-নিষেধ ও সর্বাত্মক লকডাউন। বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। স্বাস্থ্যবিধির উপর গুরুত্ব দিয়েছে।
 
তবে এবার লকডাউনে সেভাবে প্রসারিত হয়নি ত্রাণ অথবা সহায়তার হাত। বিভিন্ন স্থানে সারাদিন সাহায্যের আশায় দলবেঁধে অবস্থান করছেন নিম্নআয়ের মানুষ। খেয়ে না খেয়ে দিন কাটছে তাদের।
 
একটি পরিসংখ্যান বলছে, দেশে চলমান করোনা পরিস্থিতিতে ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষ দরিদ্রসীমার নিচে চলে গেছে। কর্মহীন হয়েছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ।
 
 
করোনার প্রকোপ বাড়ার সাথে সাথে ও লকডাউন ঘোষণার ফলে রাজধানী ছাড়ার ঢল নেমেছে নিম্নআয়ের মানুষের। গ্রামমুখী হয়েছেন অনেক মানুষ। তাদের দাবি সরকারি সহায়তা বা বিকল্প ব্যবস্থা না রেখেই ঘোষণা করা হয়েছে লকডাউন। ফলে দারিদ্র্যের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ মানুষ। বাধ্য হচ্ছেন রাজধানী ছেড়ে গ্রামমুখী হতে।
 
দীর্ঘ লকডাউনে অনেক নিঃস্ব হয়েছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা। রাজধানীর নিউমার্কেট ইসলামপুর চট্টগ্রাম সিলেটসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে মার্কেট খোলার দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন তারা। বকেয়া দোকান ভাড়া কর্মচারীর বেতন ও বেচা-বিক্রি না থাকায় নিঃস্ব হতে চলেছেন তারাও। ঘুরে দাঁড়াতে সরকারি প্রণোদনার চান তারা। দাবির মুখে বাধ্য হয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে মার্কেট খুলে দিয়েছে সরকার।
 
তবে করোনা পরিস্থিতি উত্তরণে সর্বাত্মক লকডাউন নয়, স্বাস্থ্যবিধি মেনে আর্থিক জরিমানার পক্ষে সাধারণ জনগণের বড় একটি অংশ। তাদের দাবি এমন হলে তারা ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। অন্যথায় চলমান পরিস্থিতিতে তাদের পথে নামতে হবে।
 
মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তরা জীবন ব্যবস্থা নিয়ে করছেন হা-হাকার। হিড়িক তাদের ঢাকা থেকে গ্রামমুখী হওয়ার। তাদের দাবি ঢাকার এক মাসের খরচ দিয়ে গ্রামে অনায়াসেই তিন চার মাস চলে যাবে। গ্রামমুখী হওয়াকেই চলমান পরিস্থিতির সহজ সমাধান ভাবছেন তারা। গত বছরে সঞ্চয় থাকলেও এ বছরে বাড়তে শুরু করেছে ঋণের বোঝা। চোখেমুখে অন্ধকার দেখছেন তারা।
 
করোনা পরিস্থিতি পর্যালোচনায় উঠে এসেছে অর্থনীতির ভয়ংকর চিত্র। দেশের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা দৈনিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন পৌনে ২ কোটি টাকা। সেবা খাতে  দৈনিক ক্ষতির পরিমাণ ২ হাজার কোটি টাকা। উৎপাদন ও নির্মাণ খাতে প্রতিদিন ১১ শ'  ৩১ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে। এছাড়াও পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন ৬০ লাখ পরিবার।
 
আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বন্ধ এবং বিভিন্ন দেশের নিষেধাজ্ঞা প্রবাসী শ্রমিক আসা-যাওয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বাজার কাঠামো ভেঙে পড়েছে। কমেছে বৈদেশিক রেমিটেন্সের পরিমাণ। ফলশ্রুতিতে প্রভাব পড়ছে জাতীয় জীবনে।
 
করোনাভাইরাস এ ঢেউয়ে আক্রান্তের ক্ষত স্পর্শ করেছে সমাজের উচ্চ শ্রেণি পর্যন্ত। দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান বসুন্ধরা গ্রুপ এবং এস আলম গ্রুপের মতো পরিবারের হানা দিয়েছে এই ঢেউ। প্রাণ হারিয়েছেন অনেক শিল্পপতি।
 
একই চিত্র সংসদ সদস্যদের ক্ষেত্রেও। প্রাণ হারানোর শোক নাড়া দিয়েছে তাদেরও। প্রাণ হারিয়েছেন বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্য। শতাধিক সংসদ সদস্য করোনা ভাইরাস আক্রান্ত হয়েছে। কেউ আবার আক্রান্ত হয়েছেন দ্বিতীয় দফায়।
 
বিভিন্ন স্থানে নিম্নআয়ের মানুষ সহায়তা চেয়ে হাত বাড়াচ্ছে। পুলিশের গাড়ি দেখলেই খাবারের জন্য ভিড় করছেন ভাসমান মানুষেরা। গতবারের মতো এবার তৎপরতা দেখা যায়নি রাজধানীর দুই মেয়রের। দুর্বলতা স্বীকার করে সর্বদলীয় কমিটি গঠনের দাবি বিএনপির।
 
দেশব্যাপী কঠোর লকডাউন চললেও অলি-গলিতে তার বিপরীত চিত্র দেখা গেছে। তরুনরা ভিড় করছেন বিভিন্ন অলি-গলিতে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় পাড়া-মহল্লায় আড্ডা বেড়েছে তাদের।
 
পেটের দায়ে সড়কে নামছে রিকশা ও রাইড শেয়ারিং বাইকাররা। পুলিশি হয়রানি হচ্ছে যত্রতত্র। উল্টে দেয়া হচ্ছে রিকশা। মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ বাইকারদের। তবে ভিআইপিরা খুব সহজেই পাচ্ছেন পাস।
 
ভারতের করুণ দশা কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে বাংলাদেশের কর্তাব্যক্তিদের। জাতীয় পরামর্শক কমিটি সদস্য অধ্যাপক ডাক্তার নজরুল ইসলাম বলেছেন, ভারতের সংক্রমণের বিষয়টি আমাদের জন্য চিন্তার কারণ। আইইসিডিআর এর উপদেষ্টা ডা. মোস্তাক আহমেদ বলেছেন, সীমান্তে কঠোরতা দিয়ে দেশে হাট-বাজার খুলে সভা-সমাবেশ করলে লাভ হবে না।
 
রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক ডাক্তার বে -নজীর আহমেদ বলেন, ভারতের সংক্রমণটা আমাদের দেশে আসতে পারে।
 
ঢামেকের সহকারী অধ্যাপক ডা. নাসরিন সুলতানা বলেছেন, বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগজনক যে, নতুন ভেরিয়েন্ট টির উৎস পশ্চিমবঙ্গ।
 
এদিকে দেশে সংক্রমণের ৮০ ভাগ নগর এলাকার মানুষ। তাই বিশেষজ্ঞরা নগর কেন্দ্রিক বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
 
করোনাভাইরাসের এই দুঃসময়ে স্বাস্থ্যখাতেও রয়েছে ভয়াবহ চিত্র। বিভিন্ন হাসপাতালে অতিরিক্ত ফি নেওয়া, রিপোর্ট জালিয়াতি, পরীক্ষা ছাড়াই রিপোর্ট প্রদান, নকল কিট দিয়ে পরীক্ষা করা সহ বিভিন্ন অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে।
 
চিকিৎসা এবং পরীক্ষায় জালিয়াতির অভিযোগে রাজধানীর উত্তরার রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান সাহেদকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
 
একই অভিযোগ রয়েছে জেকেজি হেলথ কেয়ারের প্রধান ডাক্তার সাবরিন আরিফের বিরুদ্ধে। যিনি প্রায় ১৫ হাজারের মতো ভুয়া রিপোর্ট প্রদান করেছিলেন।
 
এছাড়াও শাহেদ-সাবরিনার রিপোর্ট নিয়ে গত বছরের অক্টোবরে ১৫০ জনের মতো বাংলাদেশি ইতালিতে গেলে পরবর্তীতে সেখানে করোনা পরীক্ষায় তাদের পজিটিভ হওয়ায় দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। পরে এসব অভিযোগের ভিত্তিতে ৭ জুলাই রাজধানীর রিজেন্ট হাসপাতাল সিলগালা করে দেওয়া হয়। বিভিন্ন হাসপাতালে ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান পরিচালনা করা হয়।
 
করোনাভাইরাসের চিকিৎসা সুষ্ঠু ও পিসিআর ল্যাবের সমাধানকল্পে রাষ্ট্রপতির বিশেষ প্রমার্জনায় এবং প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী আদেশে সরকারের রাজস্বখাতে মেডিকেল টেকনোলজিষ্টদের দুইধাপে গত ১ ও ২ সেপ্টেম্বর ২০২ জনের ভাইভা নিয়ে নিয়োগ দেয়া হয়। কিন্তু শেখ রাসেল জাতীয় গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে কর্মরত কেউই রাজস্বখাতে নিয়োগ না পয়ে  সাত দিনের অনশন কর্মসূচি পালন করায় করোনা রোগীদের সেবা ব্যাহত হয়।
 
এমতাবস্থায় করোনাভাইরাস মোকাবিলায় ও স্বাস্থ্যখাতের জট কাটাতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট, মেডিক্যাল টেকনেশিয়ান ও কার্ডিওগ্রাফার পদে ৩ হাজার স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়ার কথা চূড়ান্ত করে সরকার।
 
স্বাস্থ্যখাতের অব্যবস্থাপনা নিয়ে দেশের অন্যতম বিরোধীদল জাতীয়পার্টির অভিযোগ করে বলেন, মানুষ এখন পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য সেবা পাচ্ছে না।  সেবা থেকে হচ্ছে বঞ্চিত। মানুষ সর্বত্র অক্সিজেন সেবা পাচ্ছে না। সামর্থ থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরেও মিলছে না অক্সিজেন এবং আইসিইউ সেবা। অক্সিজেন এবং আইসিইউ ব্যবস্থা এখন যেন সোনার হরিণ পরিণত হয়েছে।
 
স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দেশে করোনা পরিস্থিতি সামাল দিতে রাজধানীতে গড়ে উঠেছে দেশের সর্ববৃহৎ করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল। এছাড়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে মহানগর করোনা হাসপাতালের উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। এছাড়া দেশজুড়ে বিভিন্ন হাসপাতালে সম্ভাব্য সঙ্কট এড়াতে সেন্ট্রাল অক্সিজেন ব্যবস্থাসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।