ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
ব্রেকিং নিউজ

স্টাফ রির্পোটার

২৯ এপ্রিল ২০২১, ১০:০৪

করোনা ও বাংলাদেশের অর্থনীতি

17044_506055_161.jpg
ছবি: সংগৃহীত

করোনাভাইরাস শুধু স্বাস্থ্য ঝুঁকি নয়, গোটা বিশ্বের অর্থনীতিকেই তুমুলভাবে নাড়িয়ে দিচ্ছে ৷ করোনাভাইরাস আতঙ্কে একের পর এক নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ৷  স্কুল, কলেজ, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কমে আসছে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ৷ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞার কারণে লোকসানে পড়ছে বিশ্বের এয়ারলাইন্সগুলো৷ ঋণ খেলাপি হয়ে যাওয়ার আশংকায় রয়েছে বড় বড় প্রতিষ্ঠান৷ প্রতিদিনই ধ্বস নামছে প্রধান সব শেয়ার বাজারগুলোতে ৷

এরইমধ্যে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে বিশ্ব। করোনার কারণে দেশে দেশে এই সংকট তীব্র হচ্ছে। ধনী-গরিব সব দেশেই এর প্রভাব পড়েছে। বেশিরভাগ দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) সংকোচন হবে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা পূর্বাভাস দিয়েছে। কর্মহীন হয়েছেন কোটি কোটি মানুষ। অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর আভাসও পাওয়া যাচ্ছে।

 

জিডিপি প্রবৃদ্ধি

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাময়িক হিসাবে, বিদায়ী অর্থবছরে (২০১৯-২০) ৫ দশমিক ২৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে বলে জানিয়েছে। চলতি অর্থবছরে ৮ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরেছে সরকার। এমন অবস্থায় সব দাতা সংস্থাই বলছে, এত প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়।

গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টাস: জানুয়ারি ২০২১  শীর্ষক বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ২ শতাংশে। এরই মধ্যে করোনা মহামারীর চ্যালেঞ্জ সামনে এসেছে। এ কারণে চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার আরো কমে ১ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে আসতে পারে। তবে ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কিছুটা বেড়ে ৩ দশমিক ৪ শতাংশে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) বেশ ভালো পূর্বাভাস দিয়েছে। সংস্থাটি মনে করে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কার্যক্রম শুরু হয়ে গেছে। তাই চলতি অর্থবছরে (২০২০-২১) বাংলাদেশে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে এই দাতা সংস্থাটি। চীন, ভারত ও মালদ্বীপের পরই সবচেয়ে প্রবৃদ্ধি হবে বাংলাদেশে।

মুদ্রানীতি

করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে গত বছরের ২৯ জুলাই ২০২০-২১ অর্থবছরের যে মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়েছিল, তাতে মোট অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছিল ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ। সংশোধন করে তা ১৭ দশমিক ৪ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে।

মুদ্রানীতির এই পরিবর্তনে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ১৪ দশমিক ৮ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখে সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ৪৪ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩১ দশমিক ৭ শতাংশ করা হয়েছে।

গত ৩১ জানুয়ারি গভর্নর ফজলে কবিরের সভাপতিত্বে মনিটারি পলিসি কমিটির ৫০তম সভায় ২০২০-২১ অর্থবছরের মুদ্রানীতিতে এসব পরিবর্তনসহ আরো কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বৈশ্বিক ও দেশীয় অর্থনীতির সামষ্টিক চলকসমূহের সর্বশেষ পরিস্থিতি (আউটকাম) ও স্বল্প মেয়াদী দৃষ্টিভঙ্গি (আউটলুক) পর্যালোচনা করে চলতি অর্থবছরের ঘোষণা করা সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতি অব্যাহত রেখে অবশিষ্ট সময়ের জন্য মুদ্রা ও ঋণ কর্মসূচিতে মধ্য-মেয়াদী পরিবর্তন আনার কথা বলা হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে।

এ অবস্থায়, সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতি দৃষ্টিভঙ্গি অব্যাহত রেখেই নিট বৈদেশিক সম্পদের প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি এবং নিট অভ্যন্তরীণ সম্পদের প্রবৃদ্ধি কমিয়ে চলতি অর্থবছরের মুদ্রা ও ঋণ কর্মসূচিতে মধ্য-মেয়াদে পরিবর্তন আনা সমীচীন হবে বলে সভায় মত দেওয়া হয়।

আয় কর্মসংস্থান

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি বলছে, বাংলাদেশের তিন কোটি ৬০ লাখ মানুষ কাজ হারিয়েছেন। বিআইডিএসের সাম্প্রতিক জরিপে বলা হচ্ছে, করোনায় এক কোটি ৬৪ লাখ মানুষ নতুন করে গরিব হয়েছে, দারিদ্র্য সীমার নিচে নেমে গেছে। তাই এখন দেশে গরিব মানুষের সংখ্যা পাঁচ কোটির বেশি। ১৩ ভাগ মানুষ ফরমাল সেক্টর থেকে চাকরি হারিয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, করোনা দুর্যোগ শুরুর আগেও বাংলাদেশের কর্মসংস্থান পরিস্থিতি সুখকর ছিল না। বেকারের সংখ্যা ও হার বাড়ছিল। বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক, ডেটা সেন্স ও উন্নয়ন সমন্বয়ের এক যৌথ সমীক্ষায় বলা হয়েছে, প্রায় ৩৫ শতাংশ পরিবারে কমপক্ষে একজন সদস্য চাকরি হারিয়েছেন। ১৪ লাখের বেশি প্রবাসী শ্রমিক বেকার হয়ে দেশে ফিরে এসেছেন অথবা ফেরার পথে রয়েছেন। এ পরিস্থিতিতে মানুষ পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হবে। পেশার ধরন বদলে যাবে। মানুষ জীবনঘনিষ্ঠ পেশার সঙ্গে বেশি সম্পৃক্ত হবে।

পিপিআরসি ও বিআইজিডি গবেষণায় বলা হয়েছে, করোনার প্রথম দিকে অর্থাৎ এপ্রিল-জুন মাসে ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে দীর্ঘ মেয়াদে ছুটি ও লকডাউনের প্রভাবে গত এপ্রিল মাসে গরিব মানুষের আয় ৭৫ শতাংশ কমেছে। আর গরিব হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা মানুষের আয় ৬৫ শতাংশ কমেছে।

দারিদ্র্য পরিস্থিতি

করোনার কারণে দেশে–বিদেশে দরিদ্র লোকের সংখ্যা বেড়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের পভার্টি অ্যান্ড শেয়ারড প্রসপারিটি ২০২০ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনার কারণে বিশ্বের অতি দারিদ্র্যের হার ৮ শতাংশ থেকে ৯ শতাংশের বেশি হয়েছে। করোনায় বিপুলসংখ্যক মানুষ কাজ হারিয়ে অতি দরিদ্র্যের খাতায় নাম লিখিয়েছেন।

বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস ২০২০ ও ২০২১, এই দুই বছরে সারা বিশ্বের ১১ কোটি থেকে ১৫ কোটি লোক নতুন করে গরিব হয়ে যেতে পারেন। এর মধ্যে শুধু ২০২০ সালেই ৮ কোটি ৮০ লাখ থেকে সাড়ে ১১ কোটি লোক এমন বিপাকে পড়বেন। গত অক্টোবরে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের আরেক সাউথ এশিয়া ইকোনমিক ফোকাস প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনাকালে বাংলাদেশে গরিব লোকের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। দারিদ্র্য হার সাড়ে ১২ শতাংশ থেকে বেড়ে ২২ শতাংশ হয়েছে। যাঁরা দৈনিক ১ দশমিক ৯০ ডলার আয় করতে পারেন না, তাঁদের দরিদ্র হিসেবে ধরে বিশ্বব্যাংক।

করোনাকালে বাংলাদেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতি কতটা খারাপ হয়েছে, তা নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর একাধিক গবেষণা আছে। সব প্রতিষ্ঠানই বলেছে, দারিদ্র্য বেড়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) বলেছে, গত এপ্রিল থেকে জুলাই মাসের মধ্যে দারিদ্র্য হার ১৯ থেকে বেড়ে ২৯ শতাংশ হয়েছে। কমবেশি ১ কোটি ৬৪ লাখ নতুন করে গরিব হয়েছেন। এ ছাড়া আগে থেকেই সাড়ে তিন কোটি মানুষ দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাস করত।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) করোনায় মানুষের আয়-ব্যয়ে কী ধরনের প্রভাব পড়েছে, তা জানতে গত সেপ্টেম্বরে একটি জরিপ করেছে। সেই জরিপে দেখা গেছে, করোনায় আয় কমেছে ২০ শতাংশ। করোনার আগে গত মার্চে প্রতি পরিবারে মাসিক গড় আয় ছিল ১৯ হাজার ৪২৫ টাকা।