ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
ব্রেকিং নিউজ

২৯ এপ্রিল ২০২১, ১০:০৪

শ্রমিকদের মজুরী ভারসাম্য

করোনার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে প্রান্তিক পর্যায়ের শ্রমিক শ্রেণি। প্রাপ্ত তথ্যমতে, করোনাকালে শিল্প খাতের ৮০ শতাংশ মজুরি কমেছে। তাই পরিস্থিতি সামাল দিতে শ্রমিকদের ধার-দেনার জন্য হয় আত্মীয়স্বজন, নয়তো ক্ষুদ্র ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হতে হয়েছে। তৈরি পোশাক, চামড়া, নির্মাণ ও চা এই চার শিল্পখাতের শ্রমিকদের ওপর করা এক যৌথ জরিপে এসব তথ্য পেয়েছে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) ও সুইডেনের ওয়েজ ইন্ডিকেটর ফাউন্ডেশন (ডবিøউআইএফ)।
জরিপের ফলাফল বলছে, এই চার খাতের নারী শ্রমিকেরা পুরুষের তুলনায় গড়ে ৭৭ শতাংশ কম মজুরি পান। চার খাতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মজুরি পান নির্মাণশিল্পের শ্রমিকরা। আবার তাঁরাই আছেন সবচেয়ে নাজুক অবস্থায়। কারণ, এই শিল্পে কর্মরত কোনো শ্রমিকেই যৌথ চুক্তি নেই। অন্যদিকে সবচেয়ে কম মজুরি পান চা-শিল্পের শ্রমিকরা। যা শ্রমিকদের মজুরী ভারসাম্যহীনতার কথায় স্মরণ করিয়ে দেয়।
দেশে এক দশক ধরে সড়ক, মহাসড়ক, রেলওয়ে, বন্দর ও বিদ্যুৎ খাতে ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাÐ চলছে। ফলে নির্মাণশিল্পে কর্মসংস্থান বেড়েছে। ২০১৫ সালে যেখানে নির্মাণশিল্পে ৩৫ লাখ শ্রমিক কর্মরত ছিলেন, সেখানে তা বেড়ে এখন ৪০ লাখে উঠেছে। অবশ্য বিপুল এই শ্রমিকদের মাত্র এক-দশমাংশ স্থায়ী নিয়োগ চুক্তির ভিত্তিতে কাজ করেন। বাকিরা কোনো ধরনের নিয়োগপত্র ছাড়াই কাজ করছেন। ফলে এসব নিয়োগপত্রহীন শ্রমিকরা কর্তৃপক্ষের কাছে আপদকালীন কোন সুযোগ-সুবিধা পান না।
জরিপের তথ্য মতে, চারটি খাতের মধ্যে মাসে গড়ে সর্বোচ্চ ১১ হাজার ৫৪৭ টাকা করে মজুরি পান নির্মাণশিল্পের একজন শ্রমিক। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা চামড়া খাতের একজন শ্রমিক মাসে মজুরি পান ১০ হাজার ৮০০ টাকা। পোশাকশিল্প তৃতীয় অবস্থানে। এই খাতের একজন শ্রমিকেরা মাসিক গড় মজুরি ৯ হাজার ৪৫৭ টাকা। সর্বনিম্ন মজুরি চা-শিল্পে। এই খাতের একজন শ্রমিক মাসে পান মাত্র ৩ হাজার ৯২ টাকা। যা এসব শ্রমিকগোষ্ঠীর জীবন ধারণের জন্য মোটেই যথেষ্ঠ নয়।
জরিপে অংশ নেওয়া শ্রমিকদের ৮৩ শতাংশই জানান, করোনার কারণে যখন সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়, তখন তাঁরা কাজে উপস্থিত ছিলেন না। আর অনুপস্থিত সব শ্রমিকেরই মজুরি কমানো হয়েছে। যা তাদের জীবন-জীবিকাকে দুর্বিসহ করে তুলেছে।
মজুরি কমে যাওয়ার পরে কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছেন, জরিপে এমন প্রশ্নের জবাবে ৬৬ শতাংশ শ্রমিক জানান, তাঁরা পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছেন। ২৩ শতাংশ বলেছেন, সরকারের দেওয়া খাদ্যসহায়তা নেওয়ার কথা। আবার ২০ শতাংশ শ্রমিক জানান, ক্ষুদ্র ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর (এমএফআই) কাছ থেকে ঋণ নিয়েছেন তাঁরা। এ ছাড়া ৯ শতাংশ নিয়োগকর্তার কাছ থেকে রেশন পাওয়ার কথা জানিয়েছেন।
শ্রমিকদের যৌথ শ্রম চুক্তি প্রশ্নে চারটি খাতের ৭০ শতাংশ শ্রমিকই ‘নেতিবাচক’ জবাব দিয়েছেন। নিজেদের যৌথ শ্রম চুক্তির আওতায় থাকার কথা বলেছেন মাত্র ১৮ শতাংশ শ্রমিক। ৬০ শতাংশ শ্রমিক মনে করেন, চুক্তির আওতায় থাকা খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। বাকি ৪০ শতাংশের মতে, চুক্তি থাকা জরুরি।
সার্বিক দিক বিবেচনায় দেশের প্রান্তিক শ্রমিকরা নানাবিধ সমস্যায় মধ্যে রয়েছেন। এমনিতেই করোনার কারণেই অনেক শ্রমিকেরই কর্মচ্যুতি ঘটেছে। আর যারা এখনো কোনমতে কাজের মধ্যে আছেন তাদের মজুরী কমেছে ৮০ শতাংশ। অধিকাংশ শ্রমিকের নিয়োগপত্র না থাকায় তারা কর্তৃপক্ষের কাছে আপদকালীন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এমনকি অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের যৌথ শ্রমচুক্তিও নেই। মজুরী বৈষম্যও শ্রমিকদের একটি বড় সমস্যা। এমতাবস্থায় শ্রমিকদের শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় সরকার সহ সংশিষ্টদের খোলা মন নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। সরকার আগে শ্রমিকদের কর্ম ও মজুরীর নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে। কারণ, কোন বিশেষ শ্রেণিকে বঞ্চিত রেখে টেকসই জাতীয় উন্নয়ন কখনো সম্ভব নয়।