ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
ব্রেকিং নিউজ

নিজস্ব প্রতিনিধি

১৮ এপ্রিল ২০২১, ১৬:০৪

করোনা মোকাবেলায় স্বাস্থ্যখাতের দৈন্যদশা ও জনদুর্ভোগ

16912_66.jpg
বাংলাদেশে ইতিমধ্যে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ ঝড়ের মতো আছড়ে পড়তে শুরু করেছে। সংক্রমণের রেখাচিত্র প্রতিদিন ঊর্র্ধ্বমুখী হওয়ায় জনমনে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। ৬৪টি জেলার মধ্যে ৪৬টি উচ্চ সংক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছে। ঢাকায় আইসিডিডিআরবির গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে শনাক্ত করা করোনাভাইরাসের ধরনগুলোর মধ্যে এখন ৮১ শতাংশই দক্ষিণ আফ্রিকান ভ্যারিয়ান্ট। এবারের ভাইরাস খুব দ্রুতই রোগীদের অবস্থার অবনতি ঘটাচ্ছে। এখন রোগীর ফুসফুস সংক্রমণের পাশাপাশি রক্ত জমাট বেঁধে যাচ্ছে। রক্তের অণুচক্রিকার সাথে হিমোগ্লোবিনও কমে যাচ্ছে। দ্রুত রোগীকে লাইফ সাপোর্টে নিতে হয়। কোভিডের দক্ষিণ আফ্রিকান ভ্যারিয়ান্ট চিকিৎসকদের জন্য চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে।

বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ে সংক্রমণ ও মৃত্যু বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এরই মধ্যে চিকিৎসা এবং জরুরি সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলো। দেশের প্রায় দুই তৃতীয়াংশ জেলাই ভাইরাসের উচ্চ সংক্রমণ ঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানাচ্ছে স্বাস্থ্য বিভাগ।মহামারি শুরুর পর বাংলাদেশে গত একমাসে সবচে বেশি মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন।এছাড়া গত এক সপ্তাহে দৈনিক আক্রান্তের সংখ্যা সাড়ে সাত হাজারও অতিক্রম করেছে। মৃত্যুও বেড়েছে।

মহামারি শুরুর পর শনিবার ১৭ এপ্রিল একদিনে সর্বোচ্চ ১০১ জনের মৃত্যু হয়েছে।

গণপরিবহন ও পর্যটনকেন্দ্র থেকে করোনা ছড়িয়েছে বেশি এমন অজুহাতে সরকার করোনার বিস্তার ঠেকাতে সরকার ৫ এপ্রিল থেকে ১২ এপ্রিল পর্যন্ত যে লকডাউন ঘোষণা করেছে , তার সফলতা ও কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।গার্মেন্টস কারখানা ও বইমেলা খোলা রাখা বেশ কিছু অসঙ্গতি লক্ষ করা গিয়েছে ।
এসকল অসঙ্গতির পর সরকার ১৪ এপ্রিল থেকে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ ঠেকাতে আবারও এক সপ্তাহের কঠোর লকডাউন এর ঘোষনা দেন । আজকে পর্যন্ত সারাদেশে কঠোর লকডাউন বলবৎ রয়েছে ।

২০২০ সালের ৮ মার্চ সর্বপ্রথম বাংলাদেশে করোনার সংক্রমণ দেখা দেয় এবং ১৮ মার্চ মৃত্যুর খবর প্রচারিত হয়। তখন নতুন ভাইরাস, তাই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, পূর্বপ্রস্তুতির অভাব ছিল স্বাভাবিক। সে সময় একটানা ৬৬ দিন 'সাধারন ছুটির' আওতায় ছিল সমগ্র দেশ ।

কিন্তু বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন , এক বছর সময় পেয়েও দ্বিতীয় ঢেউ রোধে কার্যকর কোনো ব্যাপক উদ্যোগ চোখে পড়ার মতো নয় ।

গতবছর রাজধানী ঢাকা থেকে একেবারে উপজেলা পর্যায়ে কমিটি গঠন করা, হাসপাতাল প্রস্তুত করা , প্রচার প্রচারনা চালানো এ ধরণের নানা কাজের জন্য পরিকল্পনা করা হয়। কিন্তু এ পরিকল্পনা কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন এবং বাস্তবায়নে যথেষ্ট ধীর গতি লক্ষ করা যাচ্ছে ।

দ্বিতীয় ঢেউ রোধে প্রস্তুতি;

প্রধানমন্ত্রী সব জেলা হাসপাতালে আইসিইউ স্থাপন, আইসিইউ বেডের সংখ্যা বৃদ্ধি ও সব হাসপাতালে কেন্দ্রীয় অক্সিজেন ব্যবস্থা চালুর নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু সে নির্দেশ কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে? ৭৯টি হাসপাতালে কেন্দ্রীয় অক্সিজেন ব্যবস্থা চালু করার কথা থাকলেও আছে মাত্র ২৯টিতে।

কিন্তু স্বাস্থ্যমন্ত্রীর জাহিদ মালিক হতাশা ব্যক্ত করে বলেন , ‘করোনা মোকাবেলায় সরকারি নির্দেশনাগুলো না মানলে সংক্রমণ ও মৃত্যু নিয়ন্ত্রণহীন হতে পারে।’ জনগণকে মানতে বাধ্য করতে হবে এবং বাধ্য করার দায়িত্ব সরকারের। দ্বিতীয় ডোজের টিকা এখনো বিদেশ থেকে এসে পৌঁছায়নি। রাজধানী ও জেলা শহরের সরকারি বেসরকারি হাসপাতালে আইসিইউ বেড খালি নেই। উপজেলা সদরের সব সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ বেড নেই, নেই হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলার ব্যবস্থা। সরকার ১৮ দফা যে নির্দেশনা দেয়, তা বাস্তবায়নে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের কোনো সমন্বয় দেখা যাচ্ছে না মর্মে স্বাস্থ্যবিদদের অভিমত।

আামরা দেখতে পেয়েছি চীনসহ পৃথিবীর বহু দেশে স্টেডিয়াম, কমিউনিটি সেন্টার ও ক্লাবগুলোকে করোনা রোগীদের জন্য অস্থায়ী হাসপাতালে রূপান্তরিত করা হয়। আমাদের দেশের জেলা ও উপজেলা হাসপাতালগুলোতে যে সক্ষমতা ও ধারণক্ষমতা রয়েছে, কমপক্ষে তা দ্বিগুণ না করলে পরিস্থিতি সামাল দেয়া কঠিন হবে। উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত আইসিইউ ফ্যাসিলিটিজ না থাকায় রোগী নিয়ে স্বজনরা শহরমুখী হচ্ছেন। এতে শহরের হাসপাতালে চাপ বাড়ছে। চট্টগ্রামে ১৪টি উপজেলা হাসপাতালের মধ্যে হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা আছে মাত্র ছয়টিতে। বাকি আটটি উপজেলা হাসপাতাল খালি।

তবে শঙ্কার মধ্যেও আশার খবর হচ্ছে রাজধানীর মহাখালীতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) মার্কেট হাসপাতালের নতুন ২০০টি করোনা আইসিইউ বেড ও এক হাজারটি আইসোলেশন বেডের প্রস্তুতকরণ ও আনুষঙ্গিক কাজের দৃশ্যত বেশ অগ্রগতি হয়েছে। দুই সপ্তাহের মধ্যে কর্তৃপক্ষ তা উদ্বোধনের আশা করছে। এটি বেশ কার্যকর উদ্যোগ।

করোনাভাইরাস নিয়ে উৎকণ্ঠা, ভয় শেষ না হতেই দ্বিতীয় ঢেউ বাংলাদেশে ঝড়ের বেগের মতো আছড়ে পড়েছে। মৃতের সংখ্যা এখন প্রতিদিনিই একশো এর উপর । করোনা সম্পর্কে এখনো বিশেষজ্ঞরা সব কিছু জানেন না। সময়ের সঙ্গে এটি দুর্বল হয়ে পড়বে নাকি আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে, টিকা আদৌ আসবে কি না বা কবে নাগাদ আসবে, হার্ড ইমিউনিটি আসলেই সম্ভব কি না ইত্যাদি প্রশ্নের উত্তর এখনো ধোঁয়াশায় মধ্যে রয়েছে।

দুর্বল পরীক্ষা ব্যবস্থা:

করোনাভাইরাস পরীক্ষা করার ক্ষেত্রে দুর্বলতা রয়েছে। যেমন একটা বাসায় যদি একজনের করোনাভাইরাস হয় সেই বাসার সবাইকে সরকারিভাবে করোনা পরীক্ষা করা হয়নি এবং অনেক রোগীর ক্ষেত্রে করোনাভাইরাসের কোন উপসর্গ দেখা যায়নি। এই সব রোগীরা হিসেবের বাইরে রয়ে গেছে। তাতে করে করোনা ব্যাপক হারে ছড়িয়ে যাচ্ছে ।

পরিস্থিতি উদ্বেগের:

বাংলাদেশ-আইসিডিডিআরবির এক তথ্যে বলা হয়েছে নতুন আক্রান্তদের ৮১ শতাংশই হলো দক্ষিণ আফ্রিকান ভ্যারিয়ান্ট।এছাড়া যুক্তরাজ্যে ছড়িয়ে পড়া ভাইরাসের নতুন ধরনটিরও উপস্থিতি আগেই নিশ্চিত হওয়া গেছে বাংলাদেশে।সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ে আইসিডিডিআরবি'র এমিরেটাস বিজ্ঞানী এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ভ্যাকসিন বিষয়ক বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা কমিটির সদস্য ড. ফেরদৌসী কাদরী বলেন "আমরাতো দেখতেই পাচ্ছি ভ্যারিয়েন্টগুলো কী তাড়াতাড়ি স্প্রেড করেছে।"যুক্তরাজ্য থেকে আরম্ভ হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে সব জায়গায় ছড়িয়ে গেছে। এগুলোর ইনফেকশন রেট হায়ার, ট্রান্সমিশন অনেক হাই তবে সিভিয়ারিটির বিষয়টা আরো গবেষণা করে বলতে হবে।"

করোনায় বাংলাদেশ ও বিশ্ব অর্থনীতি

করোনায় বিপর্যস্ত বিশ্ব অর্থনীতি। বড় অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র চীন ইতিবাচক প্রবৃদ্ধিতে। চিন এ বছর রেকর্ড ১৮.৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে । বড় অর্থনীতি না হলেও যে কটি দেশে প্রবৃদ্ধি হবে, তার মধ্যে আছে বাংলাদেশ। তবে করোনায় মানুষের আয় কমেছে। ফলে দারিদ্র্য বেড়েছে। উৎপাদন কমেছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাময়িক হিসাবে, বিদায়ী অর্থবছরে (২০১৯-২০) ৫ দশমিক ২৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে বলে জানিয়েছে। সরকার দাবি করছে চলতি অর্থবছরে ৮ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জিত হবে। এমন অবস্থায় সব দাতা সংস্থাই বলছে, এত প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়।

গত শতাব্দীর ত্রিশের দশকে মহামন্দায় বড় বড় অর্থনৈতিক পরাশক্তিগুলো বিপাকে পড়েছিল। দশকজুড়ে চলে মহামন্দা। নব্বইয়ের দশকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনীতিতে আসে দুর্যোগ। আর ২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আবাসন খাত থেকে শুরু হওয়া মন্দা উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু করোনার মতো এমন সর্বজনীন মন্দা আর দেখা যায়নি। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই প্রভাব পড়েছে। কিন্তু এই মহামন্দায় বাংলাদেশের বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে । অর্থনীতি আগের জায়গায় ফিরে যেতে সময় লাগবে। এ ছাড়া করোনার দ্বিতীয় ঢেউ কতটা গভীর হয়, এর ওপর নির্ভর করছে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কতটা ত্বরান্বিত হবে। তাই ওই সব সংস্থা চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে দিয়েছে।

দারিদ্র্য পরিস্থিতি

করোনার কারণে দেশে–বিদেশে দরিদ্র লোকের সংখ্যা বেড়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের পভার্টি অ্যান্ড শেয়ারড প্রসপারিটি ২০২০ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনার কারণে বিশ্বের অতি দারিদ্র্যের হার ৮ শতাংশ থেকে ৯ শতাংশের বেশি হয়েছে। করোনায় বিপুলসংখ্যক কোটি কোটি মানুষ কাজ হারিয়ে অতি দরিদ্র্যের খাতায় নাম লিখিয়েছেন। দারিদ্র্য হার সাড়ে ১২ শতাংশ থেকে বেড়ে ২২ শতাংশ হয়েছে। যাঁরা দৈনিক ১ দশমিক ৯০ ডলার আয় করতে পারেন না, তাঁদের দরিদ্র হিসেবে ধরে বিশ্বব্যাংক।

সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে করণীয়:

দ্বিতীয় ঢেউয়ের সংক্রমণের উর্ধ্বগতি ঠেকাতে এক সপ্তাহের জন্য বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।কিন্তু মহামারি নিয়ন্ত্রণে বিজ্ঞানভিত্তিক লকডাউন নূন্যতম ১৪দিন হতে হয়। আবার যেভাবে বিধিনিষেধ পালিত হচ্ছে তাতে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ কতটা সম্ভব হবে সে প্রশ্ন উঠেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় সর্বোচ্চ কঠোর হবার তাগিদ দিচ্ছেন।

ভ্যাকসিন কার্যক্রম;

এদিকে করোনা ভাইরাসের মহামারি ঠেকাতে বড় জনগোষ্ঠীকে টিকার আওতায় আনাটা গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। ১৭ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিক টিকা কর্মসূচী শুরুর পর এপর্যন্ত প্রায় ৬০ লাখের বেশি মানুষ প্রথম ডোজের টিকা গ্রহণ করেছে।এই মহামারি মোকাবেলায় টিকাদান কর্মসূচী খুবই গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখেন বিশেষজ্ঞরা।কিন্তু টিকা নিয়েও রয়েছে চ্যালেঞ্জ।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ভ্যাকসিন বিষয়ক বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা কমিটির সদস্য ড. ফেরদৌসী কাদরী মনে করেন বিশ্বের অনেক দেশের আগে বাংলাদেশ টিকা কার্যক্রম শুরু করেছে তবে এ ব্যাপারে আরো তৎপরতা প্রয়োজন।

সর্বশেষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ও প্রাণহানির পরিসংখ্যান রাখা ওয়েবসাইট ওয়ার্ল্ডওমিটারের তথ্যানুযায়ী, এ নিয়ে বিশ্বে মোট করোনায় মৃত্যু হয়েছে ২৯ লাখ ৯৯ হাজার ২৪৬ জনের এবং আক্রান্ত হয়েছেন ১৩ কোটি ৯৬ লাখ ৭০ হাজার ৮০০ জন। এ ছাড়া সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১১ কোটি ৮৭ লাখ ১৯ হাজার ৫৬ জন। বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের এখন পর্যন্ত মোট ১০ হাজার ১৮২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে দেশে মোট শনাক্ত হওয়া রোগীর সংখ্যা হলো ৭ লাখ ১১ হাজার ৭৭৯ জন ।