ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
ব্রেকিং নিউজ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

১৭ মার্চ ২০২১, ২১:০৩

কলকাতার ‘কলেজ স্ট্রিট’ কফি হাউস মুক্তচিন্তার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত

বিজেপি কি সেই বিখ্যাত কফি হাউসেরও আদর্শিক দখল নিতে চায়?

16220_কলকাতার কফি হাউস.jpg
কফি হাউসে গেরুয়া টি-শার্ট পরিহিত বিজেপি সমর্থকরা। ছবি- সংগৃহীত
কলকাতায় যে কলেজ স্ট্রিট 'কফি হাউস' মুক্তচিন্তার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত, রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে বিজেপি সেই কফি হাউসের আদর্শকে জোর করে দখল করার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
 
সোমবার (১৫ মার্চ) সন্ধ্যায় একদল বিজেপি কর্মী গেরুয়া টি-শার্ট পরে সদলবলে কফি হাউসে যাওয়ার পরই এই বিতর্কের সূত্রপাত।
 
সেখানে তারা বিজেপি-বিরোধী পোস্টার মুছতে ও সরাতে শুরু করলে বিপক্ষের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি ও তুমুল সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। এই ঘটনার পর বিজেপি নেতারা প্রশ্ন তুলছেন, তারা কফি হাউসে গেলে অসুবিধা কোথায়?
 
রাজ্যে তাদের বিপক্ষ রাজনৈতিক শক্তিগুলো বলছে, কফি হাউসে বিজেপির আধিপত্যবাদী সংস্কৃতিকে কিছুতেই মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।
 
বস্তুত কলকাতায় প্রায় দেড়শো বছরের পুরনো কফি হাউস বরাবরই প্রগতিশীল ও কিছুটা বাম-ঘেঁষা চিন্তাচর্চার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। শহরে ভোটের প্রচার যখন তুঙ্গে, তখন সোমবার সন্ধ্যায় একদল বিজেপি কর্মী সেখানে হাজির হলে অনেকেই চমকে যান - একটু পরেই ঘটনা অপ্রীতিকর মোড় নেয়। কফি হাউসে ওঠার সিঁড়িতে সম্প্রতি 'বিজেপিকে ভোট নয়' লেখা পোস্টার সেঁটেছিল 'বেঙ্গল এগেইনস্ট ফ্যাসিস্ট আরএসএস-বিজেপি' নামে একটি সংগঠন।
 
তাদের সদস্য শ্রেয়া আচার্যি বিবিসিকে ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে বলেন, "ওদের প্রত্যেকের গায়ে ছিল 'মোদী-পাড়া' লেখা টি-শার্ট। গেরুয়া রঙের ওগুলো, তাতে মোদীর ছবি। যতজন এসেছিল, তাদের প্রত্যেকের গায়ে ছিল একই জিনিস।"
"ওভাবে ওরা ভর সন্ধেবেলা কফি হাউসে ঢুকে পড়ে এবং বিভিন্ন টেবিল দখল করে বসে পড়ে। এভাবে ওরা একটা বিশৃঙ্খলা তৈরি করে। লোকজন তো প্রথমে বুঝেই উঠতে পারেনি ঠিক কী চলছে। কফি হাউস তো আসলে এরকম দৃশ্য দেখতেই অভ্যস্ত নয়! আমরা এর আগে গোটা রাজ্য জুড়েই 'বিজেপিকে একটিও ভোট নয়' ক্যাম্পেইন চালাচ্ছিলাম।"
 
"সেই পোস্টারিং করা হয়েছিল কফি হাউসেও - যা ওরা ছিঁড়ে দেয়, পোস্টারে কালি লেপে দেয়। তো এটা কেন হবে?"
 
দলীয় কর্মীদের নিয়ে দিল্লির যে বিজেপি নেতা তেজিন্দর সিং বাগ্গা কফি হাউসে গিয়েছিলেন তার বর্ণনা আবার একটু অন্যরকম। তিনি বলছিলেন, "সেদিন প্রচারের পর কর্মীরা বললেন চলুন কফি হাউসে গিয়ে বসা যাক। তো আমরা চল্লিশ কি পঞ্চাশজন মিলে বিকেল পাঁচটা নাগাদ গেলাম, পৌনে সাতটা অবধি বসে কফিও খেলাম। যখন উঠে আসছি, তখন একজন কর্মী সিঁড়িতে 'নো ভোট টু বিজেপি' লেখা পোস্টার দেখতে পেয়ে সেই 'নো'-টা মুছে দিয়েছিলেন।"
 
"সঙ্গে সঙ্গে বামপন্থী কর্মীরা এসে আমাদের ওপর চড়াও হন, স্লোগান দিতে শুরু করেন। তবে যা হয়েছে সব সিঁড়িতে ও রাস্তায়, কফি হাউসের ভেতর কিছু হয়নি। আমার বক্তব্য, কফি হাউসে গিয়ে আমাদের এক কাপ কফি খাওয়া-ও যারা সহ্য করতে পারেন না তারা কীভাবে অপরকে অসহিষ্ণুতার কথা বলেন?", প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছেন মি বাগ্গা।
 
কলকাতার অগ্রগণ্য কবি ও রাজ্যের তৃণমূল সরকারের ঘনিষ্ঠ সুবোধ সরকার কফি হাউসে যাচ্ছেন গত পঞ্চাশ বছর ধরে।
 
তিনি কিন্তু এই ঘটনাকে স্রেফ বিজেপি নেতাদের কফিতে চুমুক দিতে যাওয়ার মতো নিরীহ পদক্ষেপ হিসেবে দেখতে রাজি নন।
 
সুবোধ সরকার বিবিসিকে বলছিলেন, "কফি হাউস আসলে বাংলার ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও নব্য সিনেমার একটি প্রতীক। এখানে বিভিন্ন চিন্তার স্রোত এসে মিশেছে। এখানে যেমন সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন আসতেন, তেমনি আড্ডা দিতে বসতেন কমলকুমার মজুমদার কিংবা সুনীল-শক্তিরাও। সত্তর দশকের দামাল দিনগুলোতেও দেখেছি সেখানে সবাইকে আসতে।"
 
"সেখানে এমন অসভ্যতা কিন্তু গত পঞ্চাশ বছরে কখনও দেখব ভাবিনি। নকশাল আমলে যখন চারপাশে ভাঙচুর চলছে, তখনও কিন্তু এই কফি হাউসের একটি চেয়ারও ভাঙা হয়নি। আজকে কফি হাউসে দাঁড়িয়ে এরা যেটা করলেন, যে পরিস্থিতি তৈরি হল, আমার ধারণা সেটা শুধু অসভ্যতা নয় - এটা আসলে একটা বৃহত্তর স্ট্র্যাটেজি বা পরিকল্পনারই অংশ।"
 
"আর সেটা হল বাঙালি সংস্কৃতির সব ঐতিহ্যশালী, মননশীল প্রতিষ্ঠানগুলো কেড়ে নিতে হবে। এবং এটা উত্তরপ্রদেশ থেকে আমদানি করা একটা হিন্দি, হিন্দু, হিন্দুস্তানি সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়!"
 
কিন্তু বিজেপি যে পাল্টা অসহিষ্ণুতার অভিযোগ তুলছে, রাজ্যে তাদের বিপক্ষ শক্তি তার জবাবে কী বলছে?
 
যে ফোরাম কফি হাউসের নিচে বিজেপি-বিরোধী পোস্টার সেঁটেছিল, তার নেতৃস্থানীয় শ্রেয়া আচার্যি সরাসরি বলছেন, বিজেপির আদর্শটাই আসলে কফি হাউসের চিন্তা-চেতনার পরিপন্থী।
 
তাঁর কথায়, "মুক্তচিন্তা বা গণতন্ত্র চর্চার যে পরিসর, বিজেপি তো তাতে বিশ্বাসই করে না। কারও গণতান্ত্রিক অধিকার তো সীমাহীন হতে পারে না। ইতিহাস সাক্ষ্য দেবে, এই বিজেপি ধর্ষণকারীদের সমর্থনে পর্যন্ত মিছিল করেছে। এখন কেউ যদি বলে সেটাও আমার গণতান্ত্রিক অধিকার, আমি এটা করতেই পারি - তাকে তো মান্যতা দেওয়া যায় না।''
"ফলে সেই জায়গা থেকে আজ কলেজ স্ট্রীট-বইপাড়া-কফি হাউসে যে মুক্তচিন্তার বাতাবরণ রয়েছে, বিজেপি তা ভাঙতে চাইলে তার উল্টোদিকেও একইভাবে রুখে দাঁড়ানোর প্রয়োজন আছে", বলছেন তিনি।
 
পশ্চিমবঙ্গে এবারের নির্বাচন অনেকটাই বাঙালি বনাম অবাঙালির সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের চেহারা পেয়েছে, কোন দল রাজ্যের প্রকৃত সংস্কৃতির প্রতিনিধি তা নিয়েও চলছে বিতর্ক। আর সেই আবহেই সবশেষ সংযোজন কফি হাউসকে ঘিরে এই ঘটনা, যেখানে আইকনিক কালো কফি বা 'ইনফিউশনে' চুমুক দেওয়া এখনও বাঙালি বুদ্ধিজীবীর পরিচিতি হিসেবেই গণ্য!
 
সূত্র: বিবিসি।